হাঁস পালন করে ভাগ্য বদলেছেন মাহফুজার

দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলিতে হাঁস পালন করে নিজের ভাগ্য বদলেছেন মাহফুজার রহমান। প্রথমে মাত্র ১০০ হাঁস দিয়ে খামার শুরু করলেও বর্তমানে তার খামারে হাঁসের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে লালনপালন করা এই হাঁসের খামার থেকে তার বছরে আয় হচ্ছে প্রায় ৫ লাখ টাকা। এতে শুধু নিজের ভাগ্যবদল নয়, এলাকার আরও অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন তিনি।

মাহফুজার রহমানের বাড়ি হিলির আলীহাট ইউনিয়নের রিকাবি চকচকা গ্রামের। ছোটবেলা থেকেই হাঁস পালন করলেও বাণিজ্যিকভাবে হাঁস পালন শুরু করেন ২০২২ সাল থেকে। ইউটিউবে হাঁস পালন দেখে মাত্র একশ দেশি হাঁসের বাচ্চা নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে হাঁসের খামারের যাত্রা শুরু করেন। রোগবালাই কম, বাজারে ডিম ও হাঁসের ভালো চাহিদা থাকায় আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই খামারে দেশি হাঁসের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজারে। এতে তার যেমন ভাগ্যের বদল ঘটেছে তেমনি সচ্ছলতার মুখ দেখছেন এলাকার আরও অনেক যুবক।

হাঁসচাষি মাহফুজার রহমান বলেন, আমি ইউটিউবে হাঁস পালন করে অনেককে লাভবান হতে দেখেছি। সেই থেকে আমিও শুরু করি। ইউটিউবে দেখেছি, ওরা বলে হাঁস পালন বেশ লাভজনক। সেই কারণে আমি রানীগঞ্জ হাট থেকে সর্বপ্রথম একশ হাঁসের বাচ্চা নিয়ে এসে খামার শুরু করেছিলাম। সেই ১০০ হাঁসের বাচ্চা তুলে লালনপালন শেষে যখন বিক্রি করলাম তখন বেশ ভালো লাভ পেলাম। এরপর পরবর্তী সময়ে পাঁচশ হাঁস তুলেছিলাম। সেটাতেও ভালো লাভ হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তুলেছিলাম ২ হাজার হাঁস। সেটি বিক্রি করেও ভালো লাভবান হই। আস্তে আস্তে ধাপে ধাপে আমার খামারে হাঁস বাড়তে থাকে। আজকে ১০ হাজার হাঁস হয়ে গেছে।

তিনি জানান, এক হাজার বাচ্চাতে খরচ বাদ দিয়ে ৬০-৭০ হাজার টাকা লাভ হয়। বর্তমানে যে হাঁস রয়েছে এগুলো বিক্রি করে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা লাভ হবে বলে আশা করছেন। তবে সবটাই অনুমাননির্ভর। হাঁসের দাম বাজারের ওপর নির্ভর করে। বাজার যদি ভালো হয় তাহলে লাভ একটু বেশি হবে। হাটে হাটে বিক্রি করতে হলে দাম কম পাওয়া যায়। হাঁসের বাচ্চা তোলার সময় থেকে আড়াই মাস পর্যন্ত লালনপালন করতে হয়। আড়াই মাসের মধ্যে হাঁস খাওয়ার মতো হয় তখন বিক্রি করা যায়। মাংসের জন্য পালন করলে সময় কম লাগে। ডিমের জন্য পালন করলে বেশি লাগে। পিস হিসেবে হাঁস বিক্রি হয় হাঁসপ্রতি ১৮০ টাকা পাইকারি দরে।

মাহফুজার রহমানের হাঁস চাষ এলাকায় সাড়া ফেলেছে। হাঁস ক্রেতা আবু সুফিয়ান বলেন, আমাদের গ্রামে মাহফুজার ভাই দেশীয় হাঁস লালন পালন করছেন। দেশি হাঁসের মাংস তো অনেক সুস্বাদু, এখানে হাঁসগুলো যখন বড় হয় তখন আমরা খাওয়ার জন্য কিনি। আমাদের মতো অনেক মানুষ এখানে হাঁস কিনতে আসে। অল্প পুঁজিতে হাঁস পালন করা সম্ভব, এটা দেখলাম মাহফুজার রহমানের হাঁস চাষ দেখে। আগে জানা ছিল না। ভবিষ্যতে চেষ্টা করব আমরাও এ রকম হাঁস পালন করার। যারা বেকার মানুষ, তারা যদি হাঁস উৎপাদন করি, তাহলে বেকারত্ব দূর হবে।

স্থানীয় অধিবাসী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, যেহেতু ধান উঠে গেছে, তাই বর্তমানে চলছে হাঁস চাষের সময়। বাজারে মুরগি বা গরুর মাংসের দাম অনেক বেশি। যার কারণে অনেকেই কিনে খেতে পারে না। আমরা যদি এগুলো খামার হিসেবে লালন-পালন করি, তাহলে ভালো হয়। এতে করে পরিবারের মাংসের চাহিদা মেটার সঙ্গে কিছুটা লাভবান হতে পারি। অনেকের আবার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়ে যায়। সেই হিসেবে হাঁস পালন অনেক ভালো বাজারে হাঁসের চাহিদা মোটামুটি ভালো রয়েছে।

দূরদূরান্ত থেকে অনেকেই মাহফুজার রহমানের হাঁসের খামার দেখতে আসেন। হাঁসের খামার দেখতে আসা ইয়াসিন আলী বলেন, আমার বাসা ঘোড়াঘাটে, আমি লোক মারফতে শুনতে পাই চকমকা গ্রামের মাহফুজার রহমান ১০ হাজার হাঁস লালন-পালন করছেন। খামার দেখে খুব সুন্দর লাগতেছে। খামার দেখে আমারও ইচ্ছা হচ্ছে, আগামীতে যদি আমিও করতে পারি। এতগুলো না পারলেও আগামীতে হয়তো আমি অল্প কিছু হাঁস দিয়ে শুরু করব।

বর্তমানে মাহফুজার রহমানের খামারে কর্মরত আছেন বেশ কয়েকজন যুবক। এদের একজন আব্দুর রহিম। তিনি সকালবেলা উঠে হাঁসের দেখাশোনা করেন, খাদ্য দেন। তারপর হাঁসগুলো নিয়ে মাঠে নিয়ে যান খাওয়াতে। খাওয়া শেষ হলে আবার তুলে আনেন। দিনে তিনবার করে খাবার দেন। সকালে একবার, দুপুরে একবার, রাত্রে একবার। তারা পাঁচজন কর্মরত আছেন এই খামারে। তিনি জানান, ‘যে টাকা বেতন দেয় সেই টাকা দিয়ে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখাসহ সংসার খরচ চালাতে পারছি। আগে বেকার ছিলাম এখন কাজ করে সংসার চালাতে পারছি।’

হাকিমপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোনতাসির মামুন বলেন, বর্তমানে আমাদের উপজেলায় অনেকে হাঁস পালনের দিকে এগিয়ে আসছেন। যেহেতু বর্তমানে বাজারে হাঁসের একটি ভালো চাহিদা দেখা যাচ্ছে, এরই পরিপ্রেক্ষিতে তারা হাঁস পালনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আমরা হাঁস পালন সম্পর্কিত সব বিষয়ে খামারিদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। যেমন হাঁসের ভ্যাকসিন সুলভ মূল্যে আমরা আমাদের দপ্তর থেকে প্রদান করে থাকি। এ ছাড়াও যেসসব উদ্যোক্তা বা খামারি নতুনভাবে হাঁস পালন করতে যাচ্ছেন, তাদের হাঁস পালন বিষয়ক বিভিন্ন পরামর্শ বা লিফলেট, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার সম্পর্কিত কীভাবে খাবার তৈরি করবেন বা খাবারে কী কী উপকরণ রাখা যেতে পারে, রোগবালাই সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে আমরা তাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। মাহফুজার রহমানের মতো অন্য বেকার যুবকরাও হাঁস চাষে এগিয়ে এলে গ্রামের বেকারত্ব সমস্যা অনেকাংশ কমবে।