বাকৃবির উদ্ভাবন হাইব্রিড ড্রায়ার

একই মেশিনে শুকানো যাবে ফল, সবজি ও মাছ

একটি সম্ভাবনা

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার পথে প্রধান সহায়ক শক্তি হতে পারে এদেশের মেহনতি কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা। তবে একটি বাস্তব প্রতিকূলতা এই সম্ভাবনার পথে সবসময় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা হলো, কৃষিপণ্যের পচনশীলতা। সহজেই পচে যায় বলে চাহিদার তুলনায় বেশি উৎপাদন করা গেলেও সংরক্ষণ করা যায় না কৃষিপণ্য। এদিকে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে যেমন দেশের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে পাঠাতে হয়, তেমনি দেশের বাইরে রপ্তানি করতেও পাড়ি জমাতে হয় দীর্ঘ পথ। উভয় ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয় দীর্ঘসময়ের। আর তাতেই ঘটে বিপত্তি। পচনশীল কৃষিপণ্য পচে যায়, অপচয় ঘটে মূল্যবান শস্যের।

প্রচলিত সংরক্ষণ পদ্ধতির সমস্যা

বাংলাদেশের কৃষি সংস্কৃতিতে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। তবে তাতেও রয়েছে নানা অসুবিধা। রোদে শুকালে একই পণ্যের সব জায়গা সমানভাবে শোকানো সম্ভব হয় না। যেখানে কাঁচা থাকে সেখান থেকেই শুরু হয় পচন। তা ছাড়া খোলা স্থানে শুকাতে দেওয়ার ফলে পোকামাকড় আক্রমণ করে পরিমাণে বেশি। তা ছাড়া ঝড়-বৃষ্টিসহ প্রতিকূল আবহাওয়ায় রোদে শুকাতে দেওয়া কৃষিপণ্য স্থানান্তরও কষ্টসাধ্য, অনেক সময় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

বিদ্যুৎ চালিত কিছু ড্রায়ার বাণ্যিজিকভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা খুবই ব্যয়বহুল। যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ছোট খামারিদের সাধ্যের বাইরেই থাকে। তা ছাড়া বিদ্যুৎ সংকটের সময় ভারী লোডশেডিংয়ের সময় ব্যবহারের অনুপযোগী থাকে। আবার ভিন্ন ভিন্ন কৃষিপণ্যের জন্য ড্রায়ার ভিন্ন হলে কৃষকদের ভোগান্তি বাড়ে বহুগুণে।

একটি আবিষ্কার সহজ সমাধান

দীর্ঘদিন থেকেই এসব নানাবিধ ও বহুমাত্রিক সমস্যা সমাধানে কৃষকরা একটি হাইব্রিড ড্রায়ারের অভাব অনুভব করছিলেন। দেশের কৃষি গবেষকরাও ওয়াকিবহাল ছিলেন এ বিষয়ে। অবশেষে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক দীর্ঘ গবেষণার পর আবিষ্কার করেছেন এমন একটি হাইব্রিড ড্রায়ার, যা কৃষকদের দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে ফেলা এই নানাবিধ সমস্যার সমাধান করবে। তাদের উদ্ভাবিত ড্রায়ারটি একই সঙ্গে মাছ, সবজি, ফল ও ভেষজ পণ্য স্বাস্থ্যসম্মতভাবে শুকানো যায়। আবার এটি একই সঙ্গে সৌরশক্তি ও গ্রিড বিদ্যুতের সমন্বয়ে পরিচালনা করা যায়। দিনের বেলায় সম্পূর্ণ সৌরশক্তিতে এবং রাতে বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিদ্যুৎচালিত হিটিং সিস্টেমের মাধ্যমে শুকানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। ফলে এই যন্ত্র ব্যবহারে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়, অপরদিকে কৃষকরা অর্থ সাশ্রয় করে আর্থিকভাবেও লাভবান হবেন। যন্ত্রটির দাম মাত্র ২ লাখ। দেশে সহজেই পাওয়া যায় এমন উপাদান দিয়েই যন্ত্রটি প্রস্তুত করা হয়েছে যাতে তৈরি করা যায় সহজে। কেনার পরে ব্যবহারকারী রক্ষণাবেক্ষণও করতে পারবেন সহজে। তা ছাড়া যন্ত্রটির ব্যবহারপ্রণালিও খুব সহজ।

রয়েছে স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

এই হাইব্রিড ড্রায়ারে আইওটি-ভিত্তিক স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করেই তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ুপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সৌরশক্তি কমে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈদ্যুতিক হিটার চালু হয়ে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন শুকানোর সুবিধা নিশ্চিত করে। প্রতিটি ব্যাচে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কেজি পণ্য শুকানোর সক্ষমতা রয়েছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি পোকামাকড়, ধুলা ও দূষণমুক্ত নিরাপদ পরিবেশে সম্পন্ন হয়।

নাইট্রোজেন গ্যাস সমৃদ্ধ প্যাকেজিং ও ভ্যাকিউম প্যাকেজিং ব্যবস্থার মাধ্যমে শুকানো পণ্যের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য ও পুষ্টিগুণ দীর্ঘসময় ধরে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়, যা রপ্তানিযোগ্য মান নিশ্চিত করতে সহায়ক।

বর্তমান মোট ২০টি হাইব্রিড ড্রায়ার নির্মাণ করা হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফলও পাওয়া গেছে।

সম্ভাবনার নতুন দিক

হাইব্রিড এই ড্রায়ারটি উদ্ভাবনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নেতৃত্ব দিয়েছেন কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. চয়ন কুমার সাহা। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১১৮ ধরনের কৃষিপণ্য ও মৎস্য ৫০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে, তবে ফসলোত্তর অপচয় বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ফল ও সবজি গড়ে প্রায় ৩২ শতাংশ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশের বেশি অপচয় হয়, আর মাছের ক্ষেত্রে এই হার ৭ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। প্রচলিত খোলা রোদে শুকানোর তুলনায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে খাদ্যের পুষ্টিগুণ ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত বজায় রাখা সম্ভব। প্রি-ট্রিটমেন্ট পদ্ধতি অনুসরণ করলে পণ্যের গুণগত মান আরও উন্নত থাকে এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আর্দ্রতা কমিয়ে ফসলোত্তর ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা যায়।

এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে অপচয়ের হাত থেকে বেঁচে যায় লাখ লাখ টাকার কৃষিপণ্য। যা রপ্তানি করে দেশ অর্জন করবে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা। এর ফলে উদ্যোক্তারা আর্থিকভাবে লাভবান হবে আগের থেকে অনেক বেশি।

কৃষি উদ্যোক্তাদের মুখে হাসি

যন্ত্রটি উদ্ভাবনের পর প্রাথমিকভাবে ২০টি ড্রায়ার কৃষি উদ্যোক্তাদের ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আশানুরূপ ফল পেয়ে হাসি ফুটেছে কৃষি উদ্যোক্তাদের মুখে। প্রযুক্তিটি ব্যবহারকারী নূর শাহিদা বলেন, আগে রোদে মাছ শুকাতাম। এর ফলে অনেক সময় সব মাছ সমানভাবে শুকানো যেত না। তা ছাড়া পোকামাকড়ের কারণে ক্ষতির মুখে পড়তে হতো। এই হাইব্রিড ড্রায়ারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সব ধরনের মাছ সঠিকভাবে শুকানো সম্ভব হচ্ছে। আগে রোদে মাছ শুকাতে হতো বলে পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল আবহাওয়ানির্ভর। এখন সেই নির্ভরতা কমেছে অনেকাংশে।

চট্টগ্রামের উদ্যোক্তা ফাতেমা ইসলাম বলেন, কেমিক্যালমুক্ত অর্থাৎ বিষমুক্ত নিরাপদ শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে তিনি এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছেন। ড্রায়ারের মাধ্যমে এখন তিনি মানসম্মত ও নিরাপদ পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি বিদেশেও সরবরাহ করতে পারছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

হাইব্রিড এই ড্রায়ারটির সফল পরীক্ষা শেষে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা তুলে ধরেন গবেষক কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. চয়ন কুমার সাহা। নতুন এই প্রযুক্তি সম্পর্কে বাকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফজলুল হক ভূইয়া বলেন, এ গবেষণাটি প্রয়োজনভিত্তিক ও সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। এ ধরনের মানসম্মত গবেষণা কার্যক্রমে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) প্রশাসন সবসময়ই সহায়তা ও সহযোগিতা প্রদান করে আসছে। প্রকল্পটির বিভিন্ন প্রতিপাদ্য বিষয়কে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে এবং আশা করছি, নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো সফলভাবে অর্জিত হবে। এ গবেষণা সমন্বিত ও স্বল্প খরচের ড্রায়িং সিস্টেম উন্নয়নে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। ভবিষ্যতের সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রযুক্তিটি ব্যাপকভাবে কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারলে কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তারা লাভবান হবেন, অর্থনীতিতে আরও কার্যকরভাবে ভূমিকা রাখতে পারবেন।

লেখক : শিক্ষার্থী, পঞ্চম বর্ষ, ভেটেরিনারি অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়