অর্থনীতির রক্ত সঞ্চালক এসএমই

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে দেশের অর্থনীতির রক্ত সঞ্চালক হিসেবে অভিহিত করেছেন শিল্প, বাণিজ্য এবং পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, ‘এসএমই যত সম্প্রসারিত হবে অর্থনীতিতে রক্ত সঞ্চালন তত বেশি হবে। এই খাতের সম্প্রসারণে বিসিক শিল্পপার্ক নতুন করে সাজানো হচ্ছে। এর মধ্যে, পাবনা ও সিলেটে ২০০ একর করে জমিতে নতুন শিল্পপার্ক করা হচ্ছে, ঠাকুরগাঁয়েরটা আরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।’   

গতকাল বুধবার রাজধানীর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : এসএমই খাতের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইআরএফ ও এসএমই ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (কর নীতি) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকীসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।

শিল্পমন্ত্রী আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১ কোটি ১৭ লাখ অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ শতাংশই হচ্ছে এমএসএমই। যদিও আমরা এখনো বৈশ্বিক স্ট্যান্ডার্ডের নিচে। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে প্রাণোদীপ্ত করতে হলে এমএসএমই খাত শক্তিশালী করতে হবে।’

বেশ কিছু উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার যে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে সেখানে ৫ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে এ খাতের জন্য। এসএমই ফাইন্ডেশনসহ দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই অর্থায়ন করা হবে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ে গতি আনতে এসএমই খাতকে শক্তিশালী করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তবে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে শিল্প উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রী ব্যবসা বাণিজ্য সহজীকরণে সরকারের বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নতুন একটি ব্যবসা শুরু করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স সংগ্রহ এবং যন্ত্রপাতি আমদানির পর্যায়ে যেতে বর্তমানে প্রায় ৩৫৫ দিন সময় লাগে। এই সময় কমিয়ে ১৪ দিনে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়নে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সরকার।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, উদ্যোক্তারা যাতে অনলাইনে এবং হয়রানিমুক্তভাবে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে পারেন, সে ব্যবস্থা করা হবে। ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্রসহ অন্যান্য লাইসেন্সও দ্রুত প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের লজিস্টিক ব্যয় বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় ১০ শতাংশ। বন্দর ব্যবস্থাপনা, সরবরাহব্যবস্থা ও পরিবহন খাতে দক্ষতা বাড়িয়ে এ ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি জানান, জ্বালানি তেল ও সয়াবিন তেলসহ আমদানিনির্ভর গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের কৌশলগত মজুদ গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘœ ঘটলেও যাতে দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকে, সে লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আরও আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের জন্য প্রায় ৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে জাতীয় শিল্পনীতি, খসড়া জাতীয় এসএমই নীতিমালা, জাতীয় ট্যারিফ নীতি ও রপ্তানি নীতিমালায় এসএমই খাতের জন্য যেসব কর-সুবিধা ও প্রণোদনার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই বাস্তবে কার্যকর হয়নি।

তিনি এমএসএমই খাতের জন্য বিদ্যমান আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক সুবিধাগুলোকে একীভূত করে ‘প্রেফারেনশিয়াল ট্যাক্স রেজিম ফর এমএসএমইস’ নামে পৃথক আইন বা এসআরও প্রণয়নের প্রস্তাব দেন।

তিনি জানান, এসএমই ফাউন্ডেশনের গবেষণা অনুযায়ী দেশে ১৭৭টি শিল্প ক্লাস্টারে প্রায় ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাই ক্লাস্টারভিত্তিক এসএমই উন্নয়নের বিকল্প নেই। এ খাতের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য এসএমই ফাউন্ডেশনের অনুকূলে বছরে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা উচিত।