বিভাগীয় শহর ময়মনসিংহের প্রধান প্রবেশদ্বার মাসকান্দা আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে তীব্র যানজট আর কাদাপানি যেন যাত্রীদের জন্য এক মূর্তিমান দুর্ভোগের নাম। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ এই টার্মিনালে নামলেও, শুরুতেই তাদের স্বাগত জানাচ্ছে একরাশ তিক্ত অভিজ্ঞতা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আধুনিকায়নের ছোঁয়া না লাগায় এবং ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত বাসের চাপে টার্মিনালটি একরকম কার্যকারিতা হারিয়েই ফেলেছে।
সারা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী বাসযোগে ময়মনসিংহে আসেন। তাদের অধিকাংশই নামেন ময়মনসিংহ শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র মাসকান্দা আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে। তবে বিভাগীয় নগরীর এই প্রধান বাস টার্মিনালে নেমেই যাত্রীদের অনেকের মধ্যে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, কাদাপানি, যানজট, নিরাপত্তাহীনতা ও যাত্রীসেবার ঘাটতি টার্মিনালটিকে দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টার্মিনালটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো আধুনিকায়ন হয়নি। পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে বাসগুলো গাদাগাদি করে রাখা হয় টার্মিনালের ভেতরে। অনেক বাস আবার স্থান সংকুলান না হওয়ায় সড়কের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এতে একদিকে যেমন যানজট বাড়ছে, অন্যদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, টার্মিনালের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে ভেতরের বেশিরভাগ অংশই কাদাপানিতে ভরা। অল্প বৃষ্টিতেই পানি জমে যায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে তা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীদের চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়।
ঢাকাগামী যাত্রী রিয়াজুল হাসনাত জানান, সামান্য বৃষ্টিতেই টার্মিনালে পানি জমে থাকে। রিকশা থেকে নেমে কাদা ও পানি পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। এতে জুতা ও পোশাক নষ্ট হয়ে যায়। টার্মিনালের ভেতরের অংশ আরসিসি ঢালাই করা হলে এ সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে বলে তারা মনে করেন।
টার্মিনালে ইউনাইটেড এসি, নন-এসি ও সৌখিন পরিবহনসহ বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টার রয়েছে। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত এখান থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে বাস চলাচল করে। বিশেষ করে বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত যাত্রীচাপ অনেক বেশি থাকে। টিকিট সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয় যাত্রীদের। এরপর আবার বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ সময়।
ভোরে ঢাকাগামী বাসের অপেক্ষায় থাকা যাত্রী কামরানসহ কয়েকজন জানান, বিভিন্ন কাজে ভোরের বাস ধরতে হয়। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। ভালো মানের টয়লেট ও নিরাপত্তা ব্যবস্থারও ঘাটতি রয়েছে। ফলে যাত্রীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
আরেক যাত্রী আফরোজা সুলতানা জানান, শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বসার কোনো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। টার্মিনালে একটি পাবলিক টয়লেট থাকলেও তা ব্যবহার করতে অর্থ দিতে হয় এবং অধিকাংশ সময় নোংরা অবস্থায় থাকে। নারী ও পুরুষকে একই টয়লেট ব্যবহার করতে হওয়ায় নারীরা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। এ ছাড়া বিশুদ্ধ পানির কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাইরে থেকে কিনে পানি পান করতে হয়। নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক বিশ্রামাগার ও টয়লেট নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
টার্মিনালের বিভিন্ন অংশ দখল করে গড়ে উঠেছে ওয়ার্কশপ ও নানা ধরনের দোকানপাট। এতে সংকুচিত হয়ে পড়েছে যানবাহন রাখার জায়গা। এ ছাড়া দিন-রাত টার্মিনাল এলাকায় বখাটেদের আড্ডা থাকায় যাত্রীরা নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবহন শ্রমিক হানিফ আলী জানান, টার্মিনালের ভেতরে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনেক সময় সড়কের ওপর বাস পার্কিং করতে হয়। যানবাহনের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। নির্দিষ্ট নিয়মে বাস রাখা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, মাসকান্দা বাস টার্মিনাল আধুনিকায়নের নামে অতীতে একাধিকবার উন্নয়নকাজ করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিম্নমানের কাজ হয়েছে। আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ অল্প সময়ের মধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে। পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় কাদা ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। যাত্রীদের জন্য উন্নত মানের ছাউনি, বসার ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটেরও অভাব রয়েছে। বিভাগীয় নগরীর এ গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল দ্রুত আধুনিকায়নের দাবি জানান তিনি।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান সরকার রোকন জানান, টার্মিনালের জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট ও ওয়ার্কশপের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ইতিমধ্যে বেশ কিছু স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। টার্মিনালে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যাত্রীদের জন্য নারী ও পুরুষের পৃথক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশ্রামাগার নির্মাণ করা হবে। সেখানে আলাদা টয়লেটেরও ব্যবস্থা থাকবে।
তিনি জানান, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য আন্ডারপাস ড্রেন নির্মাণ করে তা খালের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি টার্মিনালের প্রবেশপথ থেকে মূল ভবন পর্যন্ত একটি উন্নতমানের পার্ক নির্মাণ করা হবে। সেখানে বসার ব্যবস্থা ও বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ থাকবে, যাতে যাত্রীরা অপেক্ষার সময় স্বস্তিদায়ক পরিবেশ পান।
রুকুনোজ্জামান সরকার রোকন বলেন, স্থানীয় বাসিন্দা, বাস মালিক সমিতি, পরিবহন শ্রমিক সংগঠন, রাজনৈতিক নেতারা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে মাসকান্দা বাস টার্মিনালকে একটি আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন টার্মিনালে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
যাত্রীদের প্রত্যাশা ময়মনসিংহ বিভাগের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত মাসকান্দা আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালকে আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবহনকেন্দ্রে পরিণত করার দাবি জানিয়েছেন যাত্রী, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং নগরবাসী। তাদের প্রত্যাশা, ঘোষিত উন্নয়ন পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবেন সাধারণ যাত্রীরা।