বছরের শেষ ছয় মাস ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকে। বাড়তে শুরু করে জুন মাস থেকেই। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। গত মাসের তুলনায় চলতি জুন মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রায় চারগুণ বেড়েছে। যে হারে ভর্তি বাড়ছে তাতে সামনে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার আগাম প্রস্তুতি ভালো। সচেতনতা কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পাওয়ায় এখনো আক্রান্ত কম। তবে মাসিক বৃদ্ধির হার এবার বেশি। এভাবে বাড়তে থাকলে একটা সময় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। সেজন্য যেসব জায়গায় রোগী বেশি, সেসব এলাকায় ব্যাপকভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রকোপ ঠেকাতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে ৫ হাজার ৫১৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের। ২০২৫ সালের এই সময়ে ভর্তি হয়েছিল ৮ হাজার ৮৭০ জন। মৃত্যু হয়েছিল ৩৬ জনের। সেই তুলনায় এবার এখনো ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা অনেকটাই কম।
এবার জানুয়ারি মাসে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১ হাজার ৪১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০, মে মাসে ৭১৪ এবং জুনের ২৫ তারিখ পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ৩১৮ জন।
তবে চলতি বছরের মে মাসের ২৫ দিনে যেখানে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৬০৯ জন সেখানে জুন মাসের ২৫ দিনে ভর্তি হয় ২ হাজার ৩১৮ জন। এক মাসের ব্যবধানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ২৮১ শতাংশ।
গত বছরের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মে মাসের ২৫ দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১ হাজার ৪০০ জন। আর জুন মাসের ২৫ দিনে ভর্তি হয় ৪ হাজার ৫২৫ জন। বৃদ্ধির হার ছিল ২২৩ শতাংশ। আর মে মাসের ২৫ থেকে জুনের ২৫ তারিখ পর্যন্ত এক মাসে ভর্তি হয় ৪ হাজার ৮৯৮ জন। বৃদ্ধির হার ছিল ২৫০ শতাংশ। গত বছর পুরো মে মাসের তুলনায় এ বছরের মে মাসের রোগী ভর্তি ৬০ শতাংশ রোগী কম। ২০২৫ সালের মে মাসে ভর্তি হয় ১ হাজার ৭৭৩ জন। এবার ভর্তি হয়েছে ৭১৪ জন।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু কীভাবে প্রতিরোধ করতে হয় তা আমাদের সবারই জানা আছে। এডিশ মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আমরা যদি মশার বিস্তার আটকাতে না পারি, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমানো যাবে না। এখন যেখানে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, তা দেখে দেখে সেই সব জায়গা ব্যাপকভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে এবার এখন পর্যন্ত যা দেখছি সরকার আন্তরিক। সরকারপ্রধান নিজেই এটা নিয়ে কথা বলছেন, কাজ করছেন। এটা ভালো দিক। তবে আমাদের আর বেশি সতর্ক হতে হবে। কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে গত ২৩ জুন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় কমিটি’র প্রথম সভা হয়েছে। সভায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টাস্কফোর্সটি মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম তদারকি, প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং জরুরি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ সভায় আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
২৪ ঘণ্টায় আরও একজনের মৃত্যু : ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ২৪ ঘণ্টায় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৯৮ জন। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গু-বিষয়ক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বরিশাল বিভাগে বিভিন্ন হাসপাতালে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৪৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৫ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ২৬ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২৮ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৩১ জন, খুলনা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩১ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৩ জন এবং রাজশাহী বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৫ জন ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টায় ১৪৮ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
চলতি বছরের ডেঙ্গুতে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২ জন, মে মাসে একজন এবং জুনে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।