মহররমের ১০ তারিখ ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। হাদিসে এ দিনের রোজার বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু যুগে যুগে আশুরাকে ঘিরে অসংখ্য মনগড়া কাহিনি, দুর্বল বর্ণনা ও ভিত্তিহীন বিশ্বাস সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক মানুষ এসব ঘটনাকে সত্য মনে করলেও গবেষণায় দেখা যায়, কোরআন ও সহিহ হাদিসে সেগুলোর কোনো প্রমাণ নেই। ফলে আশুরার প্রকৃত শিক্ষা ও আমলের পরিবর্তে অনেক সময় মানুষ জাল বর্ণনা ও কুসংস্কারের অনুসারী হয়ে পড়ে। তাই আশুরা সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা জানা জরুরি।
আদম (আ.)-এর তওবা কবুল : কিছু বর্ণনায় বলা হয়, আশুরার দিন আদম (আ.)-এর তওবা কবুল হয়েছিল। তবে এ সংক্রান্ত রেওয়ায়েতের সনদ অত্যন্ত দুর্বল। আবার এ বিষয়ে বর্ণিত অন্য কিছু রেওয়ায়েতকে মুহাদ্দিসরা মওজু বা জাল বলে আখ্যায়িত করেছেন।
নুহ (আ.)-এর কিশতি থেমেছিল: প্রচলিত আছে, আশুরার দিন নুহ (আ.)-এর কিশতি জুদি পাহাড়ে এসে থেমেছিল। এ বিষয়ে মুসনাদে আহমদে একটি বর্ণনা থাকলেও তার সনদ দুর্বল। ফলে ঘটনাটিকে নিশ্চিতভাবে আশুরার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায় না।
আগুন থেকে ইব্রাহিম (আ.)-এর মুক্তি : প্রচলিত আছে, ইব্রাহিম (আ.) নমরুদের জ্বালানো আগুন থেকে আশুরার দিন মুক্তি পেয়েছিলেন। যদিও আগুন থেকে তার অলৌকিকভাবে রক্ষা পাওয়ার ঘটনা সত্য, তবে তা আশুরার দিনে ঘটেছিল বলে কোনো সহিহ দলিল পাওয়া যায় না।
মাছের পেট থেকে ইউনুস (আ.)-এর মুক্তি: অনেকের ধারণা, ইউনুস (আ.) আশুরার দিন মাছের পেট থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু সহিহ হাদিসের কোনো বর্ণনায় এ ঘটনার সঙ্গে আশুরার সম্পর্ক পাওয়া যায় না। এটি লোকমুখে প্রচলিত একটি অপ্রমাণিত ধারণা।
ঈসা (আ.)-এর জন্ম : কিছু মানুষের বিশ^াস, ঈসা (আ.) আশুরার দিন জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু এ দাবির পক্ষে কোনো সহিহ দলিল নেই। বরং এ বিষয়ে বর্ণনাগুলো দুর্বল বলে প্রমাণিত।
পৃথিবীতে প্রথম বৃষ্টি হয়েছিল : অনেকের ধারণা, পৃথিবীতে প্রথম বৃষ্টি আশুরার দিন নেমেছিল। কিন্তু গবেষক ও মুহাদ্দিসদের মতে, এ দাবির কোনো গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় ভিত্তি নেই।
১০ দিন রোজায় ১০ হাজার বছরের সওয়াব: সমাজে এমন কথাও প্রচলিত আছে, মহররমের প্রথম ১০ দিন রোজা রাখলে ১০ হাজার বছরের ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যায়। মুহাদ্দিসদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের বর্ণনা সম্পূর্ণ জাল ও বানোয়াট।
আশুরার রাতে বিশেষ নামাজ : কিছু মানুষ আশুরার রাতে ১২ রাকাত, ১০০ রাকাত বা নির্দিষ্ট নিয়মে নামাজ আদায়ের বিশেষ ফজিলতের কথা প্রচার করেন। অথচ এ বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলোকে মুহাদ্দিসরা জাল ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন।
নির্দিষ্ট আমলে সব গুনাহ মাফ হয়ে যায় : কিছু গ্রন্থে দাবি করা হয়, আশুরার রাতে নির্দিষ্ট কিছু তাসবিহ পড়লে নিশ্চিত জান্নাত কিংবা সব গুনাহ মাফের নিশ্চয়তা মেলে। এ ধরনের বর্ণনার কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই।
সুরমা ব্যবহারে বিশেষ সওয়াব : প্রচলিত রয়েছে, আশুরার দিন চোখে সুরমা লাগালে সারা বছর চোখের রোগ হয় না কিংবা মেহেদি ও তেল ব্যবহারে বিশেষ সওয়াব পাওয়া যায়। অথচ এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো দলিল নেই। তাই এগুলোকে সুন্নাহ বা বিশেষ আমল মনে করা সঠিক নয়।
আশুরার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সহিহ হাদিসের মাধ্যমে, কল্পকাহিনি বা জাল বর্ণনার মাধ্যমে নয়। তাই একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো, এ দিনকে ঘিরে প্রচলিত ভিত্তিহীন বিশ^াস পরিহার করা এবং কোরআন ও সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত আমলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া।
লেখক : ইসলামি গবেষক