জালেম শাসকের পতন

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬, ০৭:৫৪ এএম

পৃথিবীর সবচেয়ে জালেম শাসকদের একজন ফেরাউন। তার পতনের ঘটনায় মানুষের জন্য শিক্ষা ও সতর্কবার্তা রয়েছে। ক্ষমতার মোহ, অহংকার, জুলুম ও সত্যকে অস্বীকারের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেটার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হলো ফেরাউনের ঘটনা। ফেরাউন ছিল মিসরের শাসক। সে নিজেকে মানুষের রব ও উপাস্য বলে দাবি করত। তখন মুসা (আ.) সবাইকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানান। দীর্ঘ সংঘাত, বহু নিদর্শন এবং অসংখ্য সতর্কবার্তার পর আশুরার দিন পতন ঘটে ফেরাউনের।

মুসা (আ.)-এর জন্মের আগে ফেরাউনের কাছে খবর পৌঁছে, বনি ইসরাইলের মধ্য থেকে এমন একজন জন্ম নেবে, যার মাধ্যমে তার রাজত্ব ধ্বংস হবে। এই আশঙ্কা থেকে সে বনি ইসরাইলের নবজাতক পুত্র সন্তানদের হত্যা করার নির্দেশ দেয়। মেয়েদের জীবিত রাখা হতো, আর ছেলেদের নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। মহান আল্লাহ এই ভয়াবহ নির্যাতনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘স্মরণ করো, আমি যখন তোমাদের ফেরাউন গোষ্ঠী থেকে মুক্তি দিয়েছিলাম। যারা তোমাদেরকে কঠিন আজাব দিত। তোমাদের পুত্র সন্তানদের হত্যা করত এবং নারীদের জীবিত রাখত। এতে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে ছিল এক মহাপরীক্ষা।’ (সুরা বাকারা ৪৯)

এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেই জন্মগ্রহণ করেন হজরত মুসা (আ.)। আল্লাহর নির্দেশে তার মা শিশুপুত্রকে একটি বাক্সে রেখে নদীতে ভাসিয়ে দেন। আল্লাহর অদৃশ্য ব্যবস্থাপনায় সেই শিশুই গিয়ে পৌঁছায় ফেরাউনের প্রাসাদে। যে শাসক নিজের রাজত্ব রক্ষার জন্য অসংখ্য শিশুকে হত্যা করেছিল, সেই শাসকের ঘরেই লালিত-পালিত হন তিনি।

যৌবনে একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পর মুসা (আ.) মাদায়েনে চলে যান। সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থানের পর তিনি পরিবারসহ মিসরে ফেরার পথে পবিত্র তুয়া উপত্যকায় আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়্যত লাভ করেন। তাকে বিশেষ মুজিজা দান করা হয় এবং নির্দেশ দেওয়া হয় ফেরাউনের কাছে গিয়ে তাকে তাওহিদের দাওয়াত দিতে।

মহান আল্লাহর নির্দেশ ছিল, ফেরাউনের সঙ্গে নম্র ভাষায় কথা বলতে হবে, যাতে সে উপদেশ গ্রহণ করে। মুসা (আ.) ও তার ভাই হারুন (আ.) ফেরাউনের দরবারে গিয়ে তাকে এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান জানান। তারা আল্লাহর নিদর্শনও প্রদর্শন করেন। কিন্তু ফেরাউন সত্য গ্রহণের পরিবর্তে আরও বেশি অহংকারী হয়ে ওঠে। সে নিজেকে জনগণের সর্বোচ্চ রব বলে ঘোষণা করে।

ফেরাউন নিজে পথভ্রষ্ট ছিল এবং পুরো জাতিকে বিভ্রান্ত করে রাখত। সে মানুষকে সত্য থেকে দূরে রাখত। তার ক্ষমতা, সম্পদ ও বাহিনী তাকে এতটাই আত্মম্ভরী করে তুলেছিল যে, আল্লাহর শাস্তির ভয়ও তার অন্তরে কোনো প্রভাব ফেলেনি।

দীর্ঘ সময় ধরে দাওয়াত ও সতর্কবার্তা দেওয়ার পর মহান আল্লাহ মুসা (আ.)-কে বনি ইসরাইলকে নিয়ে মিসর ত্যাগের নির্দেশ দেন। এক রাতে তারা মিসর থেকে যাত্রা শুরু করেন। খবর পেয়ে ফেরাউন বিশাল বাহিনী নিয়ে তাদের পেছনে ধাওয়া করে। সামনে লোহিত সাগর, পেছনে সশস্ত্র বাহিনী। এমন সংকটময় মুহূর্তে মহান আল্লাহ মুসা (আ.)-কে লাঠি দ্বারা সাগরে আঘাত করার নির্দেশ দেন। সঙ্গে সঙ্গে সাগরের পানি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায় এবং তার মাঝে সৃষ্টি হয় নিরাপদ পথ।

বনি ইসরাইল সেই পথ দিয়ে সাগর পার হয়ে যায়। ফেরাউন ও তার সৈন্যরাও তাদের অনুসরণ করে সাগরের মধ্যে প্রবেশ করে। কিন্তু তারা মাঝপথে পৌঁছালে আল্লাহর নির্দেশে সাগরের পানি আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। মুহূর্তের মধ্যে ফেরাউন ও তার বাহিনী পানির নিচে তলিয়ে যায়।

ডুবতে ডুবতে ফেরাউন বুঝতে পারে, তার সব শক্তি ও ক্ষমতা অর্থহীন। তখন সে ঘোষণা করে, ‘আমি ইমান আনছি যে, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই, যার প্রতি বনি ইসরাইল ইমান এনেছে, আর আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা ইউনুস ৯০)

কিন্তু মৃত্যুর মুহূর্তের এই ইমান গ্রহণ তার কোনো উপকারে আসেনি। আল্লাহ জানিয়ে দেন, এখন আর তার তওবা গ্রহণ করা হবে না। এরপর আল্লাহ বলেন, ‘আজ আমি তোমার দেহ সংরক্ষণ করব, যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হয়ে থাকো।’ (সুরা ইউনুস ৯২)

হাদিসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, এই মুক্তি ও ধ্বংসের ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল ১০ মহররম অর্থাৎ আশুরার দিনে।

লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত