মহররম মাহিনা : ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না

আদর্শের লড়াইয়ে ত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত

ত্যাগ চাই, মাতম নয়। আশুরার প্রকৃত শিক্ষা এটাই। কারবালার বেদনাবিধুর ঘটনা স্মরণ করে অশ্রু ঝরানো সহজ, কিন্তু হজরত হুসাইন (রা.)-এর আদর্শ ধারণ করা কঠিন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকতে হলে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে ইমান, আদর্শ ও নীতির জন্য সংগ্রাম করতে হয়। তাই আশুরা আত্মসমালোচনা ও আত্মগঠনেরও দিন। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের নানা দুর্বলতা দূর করতে আমাদের প্রয়োজন ত্যাগ, ধৈর্য ও আত্মনিবেদন। কারবালার শিক্ষা মর্সিয়া-ক্রন্দনে নয়, বরং সত্যের পথে অবিচল থাকার দৃঢ় প্রত্যয়ে নিহিত। এই প্রত্যয়ই মানুষকে অন্যায়, জুলুম ও ভোগবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়। মহররমের বার্তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ইসলামের ইতিহাসে সম্মান ও মর্যাদা অর্জিত হয়েছে ত্যাগের মাধ্যমে। তাই আশুরার চেতনা হৃদয়ে ধারণ করে ন্যায়, সততা ও তাকওয়ার পথে নিজেদের গড়ে তোলাই আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত।

আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্ত কারবালার ঘটনা। ৬১ হিজরির ১০ মহররম, পবিত্র আশুরার দিনে কারবালার প্রান্তরে নবীজি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় দৌহিত্র হজরত হুসাইন (রা.) ও তার সঙ্গীরা শাহাদাতবরণ করেন। সেই দিনটি মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায়গুলোর একটি। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও কারবালার রক্তস্নাত স্মৃতি আজও মুসলমানদের হৃদয়ে সমানভাবে জাগরূক রয়েছে।

হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর তার ছেলে ইয়াজিদ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। কিন্তু মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ ইয়াজিদের নেতৃত্বকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেনি। বিশেষ করে হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারের সদস্য এবং অনেক বিশিষ্ট সাহাবি তার শাসনব্যবস্থা নিয়ে আপত্তি প্রকাশ করেন। ইয়াজিদ ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য হজরত হুসাইন (রা.)-এর কাছ থেকে বাইয়াত তথা আনুগত্যের অঙ্গীকার দাবি করে।

মদিনার গভর্নরের মাধ্যমে এ বার্তা পৌঁছানো হলে হজরত হুসাইন (রা.) তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ তিনি মনে করতেন, একজন জালেম ও অন্যায়কারী শাসকের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা ইসলামের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠলে তিনি মদিনা ত্যাগ করে মক্কায় চলে যান।

এদিকে কুফার অসংখ্য মানুষ হজরত হুসাইন (রা.)-এর কাছে চিঠি পাঠিয়ে তাকে মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব গ্রহণের আহ্বান জানায়। তারা প্রতিশ্রুতি দেয় যে, তাকে সমর্থন করতে তারা প্রস্তুত। প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ের জন্য হজরত হুসাইন (রা.) তার চাচাতো ভাই হজরত মুসলিম ইবনে আকিল (রা.)-কে কুফায় পাঠান। সেখানে পৌঁছে মুসলিম ইবনে আকিল (রা.) দেখতে পান, বহু মানুষ সত্যিই হজরত হুসাইন (রা.)-এর প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে এবং তার হাতে বাইয়াত করছে।

কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ইয়াজিদ কুফার নতুন গভর্নর হিসেবে উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদকে নিয়োগ করে। ক্ষমতালোভী ও কঠোর স্বভাবের এই শাসক কুফায় এসে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। হজরত হুসাইন (রা.)-এর সমর্থকদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিভিন্ন কৌশলে জনগণকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। একসময় হাজার হাজার সমর্থক মুসলিম ইবনে আকিল (রা.)-এর পাশ থেকে সরে যায়। অবশেষে তাকে গ্রেপ্তার করে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়।

শাহাদাতের আগে মুসলিম ইবনে আকিল (রা.) ইমাম হোসাইন (রা.)-কে একটি বার্তা পাঠিয়ে কুফায় না আসার পরামর্শ দেন। কিন্তু সেই বার্তা পৌঁছানোর আগেই হজরত হুসাইন (রা.) পরিবার-পরিজন ও ঘনিষ্ঠ সঙ্গীদের নিয়ে কুফার উদ্দেশে রওনা হয়ে যান। পরে মুসলিম ইবনে আকিল (রা.)-এর শাহাদাতের খবর পেয়ে তিনি পরিস্থিতি পুনর্বিবেচনা করেন এবং অন্য পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইয়াজিদের সৈন্যরা তার পথরোধ করে।

শেষে তিনি কারবালা নামক প্রান্তরে অবস্থান নিতে বাধ্য হন। তার সঙ্গে ছিলেন পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, নারী, শিশু এবং অল্পসংখ্যক বিশ^স্ত সঙ্গী। অন্যদিকে ইয়াজিদের বাহিনী ছিল বিপুল সংখ্যক এবং সশস্ত্র।

কারবালায় অবস্থানকালে হজরত হুসাইন (রা.) বারবার শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করেন। কিন্তু তার কোনো প্রস্তাবই গ্রহণ করা হয়নি। একসময় তার শিবিরের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করা হয়। এমনকি ফোরাত নদীর পানি থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হয়। তৃষ্ণার্ত শিশুদের কান্না এবং নারীদের দুর্ভোগ তখন শিবিরজুড়ে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

মহররমের ১০ তারিখে যুদ্ধ শুরু হয়। সংখ্যায় অতি অল্প হওয়া সত্ত্বেও হজরত হুসাইন (রা.)-এর সঙ্গীরা অসাধারণ সাহসিকতা প্রদর্শন করেন। একে একে তার প্রিয়জন, আত্মীয় এবং সাথিরা শাহাদাতবরণ করেন। হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারের তরুণ সদস্যরাও বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে শহীদ হন।

যুদ্ধের একপর্যায়ে হজরত হুসাইন (রা.) প্রায় একাকী হয়ে পড়েন। অসংখ্য তীর, বর্শা ও তরবারির আঘাতে তার দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। তবুও তিনি সত্যের অবস্থান থেকে এক চুলও সরে যাননি। অবশেষে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, শাহাদাতের পর তার পবিত্র দেহে বহু বর্শা, তরবারি ও তীরের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। তার সঙ্গে থাকা প্রায় বাহাত্তর জন সঙ্গীও শাহাদাতবরণ করেন।

কারবালার ঘটনায় সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ধৈর্য, ত্যাগ এবং মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার শিক্ষা। যুদ্ধের আগের রাতে হজরত হুসাইন (রা.) তার সঙ্গীদের বলেছিলেন, যার ইচ্ছা তারা চলে যেতে পারে। কারণ সামনে নিশ্চিত মৃত্যু অপেক্ষা করছে। কিন্তু কেউ তাকে ছেড়ে যেতে রাজি হননি। বরং সবাই তার পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

তার সঙ্গীরা জানতেন, এ যুদ্ধ জয়ের জন্য নয়, বরং সত্যের পক্ষে অবস্থান গ্রহণের জন্য। তাই তারা জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধা করেননি। এই ঘটনা প্রমাণ করে, ইমানদার মানুষের কাছে আদর্শ ও সত্যের মূল্য পার্থিব জীবন থেকেও বড়।

কারবালার গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা হলো মানবিকতা। শত্রুপক্ষের প্রতি কঠোর বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও হজরত হুসাইন (রা.) মানবিক মূল্যবোধ বিসর্জন দেননি। যখন তার শিবিরে পানি ছিল, তখন তিনি শত্রুসৈন্যদেরও পানি পান করতে দিয়েছিলেন। আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সময় ছিলেন অটল ও আপসহীন।

আজও কারবালা মুসলিম উম্মাহকে স্মরণ করিয়ে দেয়, অন্যায় ও জুলুমের সামনে নীরব থাকা একজন মুমিনের কাজ নয়। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন হলে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ নয়, বরং ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণই একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়।

তবে আশুরার গুরুত্ব শুধু কারবালার ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আশুরা ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন, যার মর্যাদা কারবালার বহু আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজা পালন করেছেন এবং উম্মতকেও তা পালনের উৎসাহ দিয়েছেন। তাই আশুরার ধর্মীয় গুরুত্ব এবং কারবালার ঐতিহাসিক গুরুত্বকে পৃথকভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামি গবেষক