পদ্মা সেতুর ৪ বছর

সড়কপথে রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় সম্ভাবনার দুয়ার খোলা পদ্মা সেতুর ৪ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০২২ সালের ২৬ জুন পদ্মা সেতুতে শুরু হয় যান চলাচল। এরপর গত ৪ বছরে পারাপার হয়েছে ২ কোটি ৬৬ লাখ ৯৭ হাজার ৫১৪ টি যানবাহন। এতে টোল আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৩০০ কেটি ৩২ লাখ ১৬ হাজার  ১১৪ টাকা। অর্থাৎ চার বছরে প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ১০.৭ শতাংশ সমপরিমাণ টাকা টোল থেকে আদায় হয়েছে। এই হিসাবে গড় হারে টোল আদায় অব্যাহত থাকলে প্রকল্প ব্যয়ের সমপরিমাণ টাকা উঠে আসতে প্রায় ৩৭ বছর লাগবে। যদিও টার্গেট করা হয়েছে ৩৫ বছর।

পদ্মা সেতু দক্ষিণের মানুষের বিড়ম্বনা লাঘব করে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। উত্তাল পদ্মা নদী পারাপারের ভোগান্তি থেকে শুধু মুক্তিই দেয়নি এই সেতু, পাল্টে দিয়েছে দক্ষিণের আর্থ-সামাজিক অবস্থাও। উৎপাদিত

কৃষিপণ্য বাজারজাত, শিল্প কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্যেও যুগান্তকারী পরিবর্তনের ফলে খুলে গেছে সম্ভাবনার দুয়ার। বর্তমানে সেতুর উপর তলায় সড়ক পথে চলছে বিভিন্ন যানবাহন আর নিচ দিয়ে ছুটছে ট্রেন। রাতদিন দ্রুত বেগে পদ্মার উপর দিয়ে চলছে দুই ধরনের যানবাহন।

পদ্মা সেতুর মূল দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার, তবে অ্যাপ্রোচসহ মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ কিলোমিটার। ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধনের পরদিন ২৬ জুন পদ্মা সেতুতে সড়কপথের যান চলাচল শুরু হয়। সঙ্গে শুরু হয় টোল আদায় কার্যক্রম। এরই মধ্যে যুক্ত হয়েছে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেম। পরের বছর ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর রেলপথ উদ্বোধন হয়। পদ্মা সেতু হয়ে চালু হয় ঢাকা-ভাঙ্গা নতুন রেল নেটওয়ার্ক। আর ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর রেল লিঙ্ক প্রকল্প পুরোপুরি চালু হয়। এদিন রাজধানী থেকে পদ্মা সেতু দিয়ে ভাঙ্গা হয়ে নতুন পথে নড়াইল ও যশোর অতিক্রম করে খুলনা পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। রাজধানী থেকে মাত্র সাড়ে ৩ ঘণ্টায় খুলনা ও বেনাপোল পৌঁছানো যাচ্ছে। তাই এখন দক্ষিণের মানুষ সড়ক ও ট্রেন পথের সুফল পাচ্ছে।

এর আগে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পায়রা ও রামপালের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হয় পদ্মা সেতু প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা খুঁটি ব্যবহার করে। সেতুর উপর দিয়ে যাওয়া উচ্চ ক্ষমতার ইন্টারনেট লাইন ব্যবহার হচ্ছে। সেতুতে নির্মাণ করে রাখা গ্যাস লাইন ব্যবহারে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে দক্ষিণের জনপদ, এখন শুধুই অপেক্ষা।

পদ্মা সেতুর সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ নিলয় জানিয়েছেন, গত ২৪ জুন পর্যন্ত ৪ বছরে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্ত দিয়ে যানবাহন পারপার করা হয়েছে দুই কোটি ৬৬ লাখ ৯৭ হাজার ৫১৪টি। টোল আদায় তিন হাজার ৩০০ কোটি ৩২ লাখ ১৬ হাজার ১১৪ টাকা। অর্থাৎ প্রতি বছরে গড়ে আদায় হচ্ছে ৮২৫.২৩ কোটি টাকা। এই হিসেবে ৩৭ মোট ব্যয়ের টাকা উঠে আসার কথা। তবে সেতুসংশ্লিষ্টদের মতে, যানবাহনের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, টোলের টাকার হারও বছর বছর যে হারে বাড়ছে তাতে পূর্ব নির্ধারিত ৩৫ বছরের আগেই মোট ব্যয়ের টাকা উঠে আসবে।

পদ্মা সেতুতে একদিনে সর্বোচ্চ যানবাহন চলাচল করেছে ২০২৫ সালে ঈদুল আজহা উপলক্ষে ৫ জুন। ২৪ ঘন্টায় মাওয়া ও জাজিরা প্রান্ত দিয়ে পারাপার করেছে ৫২ হাজার ৪৮৭টি গাড়ি। টোল আদায় হয়েছে ৫ কোটি ৪৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা নদীর বুকে চালু হয় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘের  দেশের অন্যতম বৃহৎ পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পটি। প্রকল্পের সর্বশেষ প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। সর্বশেষ চূড়ান্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। বাকি ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দিয়েছে অর্থ বিভাগ। ঋণ চুক্তি অনুযায়ী এক শতাংশ সুদসহ ৩৫ বছরে ঋণের টাকা ফেরত দেবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। ঋণ পরিশোধের শিডিউল অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরে চারটি কিস্তি করে সর্বমোট ১৪০টি কিস্তিতে সুদ-আসল পরিশোধ করা হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী এই ঋণ পরিশোধের জন্য ২০৫৬-৫৭ অর্থবছর পর্যন্ত সময় পাবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।