ভোলার তজুমদদীন উপজেলার মেঘনা নদীবেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা এখন ভয়াবহ সংকটে। শিক্ষক স্বল্পতা, অনিয়মিত উপস্থিতি, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতিতে একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কার্যত পাঠদান কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। কোথাও নিয়মিত ক্লাস নেই, কোথাও আবার শ্রেণিকক্ষ পরিণত হয়েছে বসবাসস্থল বা দখলকৃত স্থানে।
স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে পরিস্থিতির কোনো কার্যকর উন্নতি হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিক্ষার অধিকারই এখন প্রশ্নের মুখে।
চর মোজাম্মেল ও চর জহির উদ্দিনসহ বিভিন্ন চরের অন্তত ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনুমোদিত পদের তুলনায় অর্ধেকেরও বেশি পদ শূন্য থাকায় অনেক বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক দিয়েই কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। কোথাও আবার অনিয়মিতভাবে প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে কোনোভাবে ক্লাস চালানো হচ্ছে।
নাগর পাটোয়ারীর চরের পূর্ব বিশারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৭৫ জন শিক্ষার্থী থাকলেও চলতি বছরে নিয়মিত কোনো ক্লাস হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীরা জানায়, শিক্ষকরা মাঝে মাঝে এলেও পাঠদান হয় না, ফলে তারা পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে চর মোজাম্মেলের পশ্চিম রামদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি ভবন স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে খাট, চৌকি ও গৃহস্থালি সামগ্রী রেখে সেখানে বসবাস চলছে। স্থানীয়দের দাবি, সেখানে দিন-রাত আড্ডা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডও হয়।
একই চরের আরেকটি বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষকে আবাসিক ঘর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে বিভিন্ন আসবাবপত্র রেখে কয়েকজন বসবাস করছেন, ফলে শিক্ষার পরিবেশ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
মেঘনার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মোহাম্মদ ভেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে একটি টিনশেড ছোট ঘরে ৬৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে চলছে। সীমিত জায়গা ও অবকাঠামোতে পাঠদান চালালেও শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
৭৯ নম্বর চর জহির উদ্দিন রেডক্রিসেন্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন মূল শিক্ষকের পরিবর্তে সম্মানীর ভিত্তিতে নিয়োজিত একজন শিক্ষক দিয়ে ক্লাস করানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, মূল শিক্ষক নিয়মিত উপস্থিত না থাকায় পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, শিক্ষক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং নিয়মিত তদারকির অভাবে চরের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এসব এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, চর মোজাম্মেল ও চর জহির উদ্দিনের ১০টি বিদ্যালয়ে মোট ৫৯টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৯ জন শিক্ষক। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় ৭৬৬ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রিয়াজ আলম জানান, দুর্গমতার কারণে নিয়মিত তদারকিতে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে শিক্ষক সংকট ও অনিয়মের বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, “বিদ্যালয় দখল ও অনিয়মের বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সব মিলিয়ে চরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে—যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা অধিকারই হুমকির মুখে।