মাচায় পটল চাষে স্বপ্ন বুনছেন বাগাতিপাড়ার কৃষকরা

মাচার পর মাচাজুড়ে সবুজ লতায় ঝুলছে অসংখ্য পটোল। ভোরের আলো ফুটতেই ক্ষেতের পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন কৃষকেরা। একসময় যে জমিতে প্রধানত ধান ও অন্যান্য মৌসুমি ফসলের আবাদ হতো, এখন সেই জমির বড় একটি অংশজুড়ে দেখা মিলছে পটলের চাষ। অধিক লাভ, বাজারে সারা বছর চাহিদা এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকি থাকায় নাটোরের বাগাতিপাড়ায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পটল চাষ।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় বছরে প্রায় ১ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ হয়। এর মধ্যে চলতি খরিফ-১ মৌসুমে ৫৬ হেক্টর জমিতে পটলের আবাদ হয়েছে। গত বছর তিন মৌসুমে মিলিয়ে ১১১ হেক্টর জমিতে পটল চাষ হয়েছিল। গড়ে এ বছর এক মৌসুমেই গত বছরের অর্ধেক পরিমাণ জমিতে মাচায় পটল চাষ হয়েছে। উপজেলার সব ইউনিয়নেই কমবেশি পটলের চাষ হলেও দয়ারামপুর ইউনিয়নে এর আবাদ সবচেয়ে বেশি। 

কৃষি বিভাগ ও কৃষকদের প্রত্যাশা, উৎপাদন ও বাজারদর অনুকূলে থাকলে পটল চাষ ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য আরও লাভজনক ও সম্ভাবনাময় ফসলে পরিণত হবে।

স্থানীয় কৃষি বিভাগ বলছে, কীটনাশক ফাঁদ ব্যবহার করে নিরাপদ সবজি উৎপাদন কৃষকদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। কারণ এতে কীটনাশকের ব্যবহার হ্রাস পায়। পটোলের আবাদ বাড়াতে আধুনিক পদ্ধতিতে পটোল এবং পোকামাকড় ও রোগ দমনে আইপিএম পদ্ধতিসহ বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন তারা।

স্থানীয় পটলচাষিরা জানান, অনুকূল আবহাওয়া, উর্বর মাটি এবং নিয়মিত পরিচর্যার কারণে এ অঞ্চলে পটলের বাম্পার ফলন হচ্ছে। জমি প্রস্তুত, বীজ সংগ্রহ, সার প্রয়োগ ও মাচা নির্মাণসহ প্রতি বিঘা জমিতে পটল চাষে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। তবে একবার নাইলনের সুতা দিয়ে মাচা তৈরি করলে তা টানা তিন থেকে চার বছর ব্যবহার করা যায়, ফলে পরবর্তী বছরগুলোতে উৎপাদন খরচ অনেকটাই কমে আসে। 

কৃষকেরা বলেন, পটলের বাজার চাহিদা সারা বছরই থাকায় উৎপাদিত ফসল বিক্রি নিয়ে তেমন কোনো শঙ্কা থাকে না। সঠিক সময়ে সেচ, আগাছা দমন, সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি বিঘা জমি থেকে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হওয়ায় অন্যান্য ফসলের তুলনায় পটোল চাষে কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।

উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের স্বরাপপুর গ্রামের কৃষক বাদশা আলী জানান, চলতি মৌসুমে তিনি দেড় বিঘা জমিতে পটল চাষ করেছেন। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, সেচ ও মাচা তৈরিসহ প্রতি বিঘায় তার খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে তিনি ৫০ হাজার টাকার পটল বিক্রি করেছেন। মৌসুম শেষে প্রায় লক্ষাধিক টাকার পটল বিক্রি করবেন বলে আশা করেন তিনি।

উপজেলার সদর ইউনিয়নের আরজুমারিয়া নওশেরা এলাকার কৃষক পলাশ কুমার বলেন, নদী অববাহিকা এলাকা মাটি বেলে দোঁআশ হওয়ায় বৃষ্টির পানি না দাঁড়ানোর কারণে সবজি জাতীয় ফসল এ এলাকায় ভালো হয়।দীর্ঘদিন থেকে তিনি পটলের চাষ করে আসছেন। নিয়মিত পরিচর্যা করলে ফলন ভালো হয়। কিছুদিন আগেও বাজারদর সন্তোষজনক ছিল বর্তমান বাজার কিছুটা নিচের দিকে। সব মিলিয়ে পটলের সিজনজুড়ে একটা ভালো দাম থাকায় পটল চাষে আগ্রহ বাড়ছে।

উপজেলার দয়ারামপুর ইউনিয়নের চিবনাপুর এলাকার পটলচাষি আবু হাসান বাপ্পি জানান, আগে তিনি জমিতে ধান ও অন্যান্য ফসল করতেন। কিন্তু খরচের তুলনায় লাভ কম হওয়ায় কয়েক বছর ধরে পটল চাষ করছেন। চলতি মৌসুমে তিনি ৭ কাঠা জমিতে পটলের আবাদ করেছেন। জমির পরিচর্যা, মাচা তৈরির বাঁশসহ বেশিরভাগ উপকরণ নিজের হওয়ায় এ পর্যন্ত তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে তিনি প্রায় ২০ হাজার টাকার পটল বিক্রি করেছেন। 

তিনি বলেন, এবার জমিতে নতুন গাছ লাগানো হয়েছে, ফলে সামনে আরও ভালো ফলনের আশা করছেন। এছাড়াও দ্বিতীয় বছর মুড়ি পটলের থেকেই আরও ভালো মুনাফা পাওয়া যায়। বাজারদর অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার পটল বিক্রি করতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

স্থানীয় পটল চাষি আরও জানান, বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি পটল ২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে বাজার দর কম থাকলেও প্রথম দিকে তারা বেশি দাম পেয়েছেন। আর কিছুদিন পরে বর্ষা মৌসুমে আবার দাম আরও একটু বাড়লে পুশিয়ে যাবে। তারা জানান অনেকেই আগামী মৌসুমে আবাদ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা তারা করছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ভবসিন্দু রায় বলেন, পটল চাষে কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। নিরাপদ সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যে আইপিএম পদ্ধতি, ফেরোমন ফাঁদ ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। 

তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলায় খরিফ-১ মৌসুমে ৫৬ হেক্টর জমিতে পটলের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় এক মৌসুমেই অর্ধেক। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন তিনি। আর পটল চাষ ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য আরও লাভজনক ও সম্ভাবনাময় ফসলে পরিণত হবে।