কৃষকদের দোরগোড়ায় কৃষি সেবা পৌঁছে দিতে বহু বছর আগে বাগাতিপাড়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে নির্মাণ করা হয়েছিল বীজ সংরক্ষণাগার বা সীড স্টোর ভবন। এসব ভবনে প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের (এসএএও) রাত্রিযাপনের ব্যবস্থাও ছিল। পাশাপাশি প্রান্তিক কৃষকদের প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগও রাখা হয়েছিল। তবে বহু বছর ধরে এসব সরকারি ভবন ব্যবহারহীন ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনগুলো দিনকে দিন জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে। ফলে একদিকে যেমন কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবনগুলো সংস্কার করে কৃষি বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যবহার করা গেলে সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সেবা কার্যক্রম আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় ও কৃষি বিভাগের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা এসব সরকারি ভবনের দ্রুত সংস্কার ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এতে সরকারি সম্পদ রক্ষা পাবে এবং কৃষি সেবাও আরও গতিশীল হবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪টি ইউনিয়নে বীজ সংরক্ষণাগার বা সীড স্টোর ভবন রয়েছে। প্রান্তিক কৃষকদের দোরগোড়ায় কৃষি সেবা পৌঁছে দিতে এবং কর্মরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের (এসএএও) ইউনিয়ন পর্যায়ে অবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এসব ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। এছাড়া কৃষকদের দ্রুত ও কার্যকর সেবা প্রদানেও এসব স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা ছিল। তবে দীর্ঘ বছর ধরে অধিকাংশ ভবনই ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত এসব অবকাঠামো বর্তমানে অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হতে বসেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে নির্মিত বীজ সংরক্ষণাগার (সীড স্টোর) ভবনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে রয়েছে। অনেক ভবনের দরজা-জানালা নষ্ট হয়ে গেছে, দেয়ালে দেখা দিয়েছে ফাটল এবং বিভিন্ন স্থানে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। ভবনগুলোর চারপাশে গজিয়ে উঠেছে ঘন ঝোপঝাড়, যা সেগুলোকে আরও পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় কিছু ভবন প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এছাড়া কয়েকটি ভবনের কক্ষ স্থানীয়দের দখলে চলে গেছে। কোথাও ভবন দখল করে চায়ের দোকান গড়ে উঠেছে, আবার কোথাও নিয়মিত বসছে ক্যারাম খেলার আড্ডা। ফলে কৃষি সেবার উদ্দেশ্যে নির্মিত এসব সরকারি স্থাপনা বর্তমানে তাদের মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পর্যায়ের বীজ সংরক্ষণাগার (সীড স্টোর) ভবনগুলো সচল থাকলে কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও গতিশীল হতো এবং কৃষকরা সহজেই প্রয়োজনীয় পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেতেন। এসব ভবন কার্যকর থাকলে কৃষি বিভাগের অনেক সেবা ইউনিয়ন পর্যায় থেকেই পাওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু ভবনগুলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারহীন থাকায় বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সেবা নিতে কৃষকদের উপজেলা সদরে যেতে হচ্ছে, যা সময় ও অর্থ উভয়েরই অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি করছে। বর্তমানে ভবনগুলো অযত্নে পড়ে থাকায় সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনাগুলোর কার্যকারিতা হারিয়ে যাচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, ভবনগুলোর বর্তমান অবস্থা ও ব্যবহার নিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ কৃষি অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
উপজেলা পৌরসভার দায়িত্বে নিয়োজিত এক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (এসএএও) মো. মাহাতাব উদ্দিন জানান, তিনি পাশের জেলা থেকে প্রতিদিন বাগাতিপাড়ায় এসে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কর্মস্থলে আসা-যাওয়া করতে হয়, যা বেশ কষ্টসাধ্য। বীজ সংরক্ষণাগারগুলো ভবনগুলো যদি ভালো থাকত তো সেখানে অবস্থান করে দায়িত্ব পালন করা অনেক সহজ হত। তিনি আরও জানান, উপজেলার সব সীড স্টোরগুলোর অবস্থাই বর্তমানে নাজুক।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ভবসিন্ধু রায় জানান, ইউনিয়ন পর্যায়ের বীজ সংরক্ষণাগারগুলো বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। পুরোনো ভবনগুলোর স্থানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন নতুন ভবন নির্মাণ করা হলে সেখানে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের আবাসন, কৃষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং বীজ সংরক্ষণাগারের ব্যবস্থা রাখা সম্ভব হবে। এতে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরা আরও সহজে কৃষি সেবা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পাবেন এবং কৃষি কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
তিনি আরও জানান, ভবনগুলোর বর্তমান অবস্থা ও ব্যবহার সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে কৃষি অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।