ব্রাজিলের হেক্সা মিশনে বাঁধা জিকোর সেই জাপান

ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২ (নকআউট পর্ব)-এর সবচেয়ে হাই-ভোল্টেজ ম্যাচগুলোর একটিতে মুখোমুখি হচ্ছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ও এশিয়ার পরাশক্তি জাপান। আগামী ২৯ জুন হিউস্টনের মাঠে শেষ ১৬'র টিকিট কাটার এই মহারণ শুরু হওয়ার আগেই মাঠের বাইরে উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। শৃঙ্খলা ও নিখুঁত পরিকল্পনার সূর্যোদয়ের দেশ জাপান যেখানে ব্রাজিলকে বিদায় করে এখনই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, সেখানে সেলেসাও কিংবদন্তি জিকো নিজের দেশকে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন—আজকের জাপান যেকোনো পরাশক্তিকে স্তব্ধ করে দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

শতবর্ষের পরিকল্পনা নেমে এসেছে ২০২৬-এ!

১৯৯২ সালের আগে জাপানে কোনো পেশাদার ফুটবল লিগই ছিল না। ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি জিকোর হাত ধরে দেশটির ফুটবলে পেশাদারিত্বের ছোঁয়া লাগে। প্রথমে খেলোয়াড় এবং পরে কোচ হিসেবে জাপানি ফুটবলের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন জিকোই।

প্রাথমিকভাবে জাপান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন একটি ‘১০০ বছরের পরিকল্পনা’ হাতে নিয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল ২০৯২ সালের মধ্যে বিশ্বকাপ জেতা। পরবর্তীতে মাঠের অভাবনীয় সাফল্যে লক্ষ্য এগিয়ে ২০০৫ সালে ঘোষণা দেওয়া হয় ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার। কিন্তু ব্লু সামুরাইদের ফুটবলীয় উন্নতি হচ্ছে এতটাই অবিশ্বাস্য গতিতে যে, ২০৫০ সালের সেই মহাপরিকল্পনা তারা এই ২০২৬ বিশ্বকাপেই বাস্তব রূপ দিতে মরিয়া।

জাপানের এই দলটি বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছে

ভবিষ্যতের পরিকল্পনার চেয়ে মাঠের বর্তমানকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন জাপানি ফুটবলাররা। ব্রাজিলের বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে জাপানের গোলরক্ষক জায়ন সুজুকি সরাসরি হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, 

"আমাদের একমাত্র লক্ষ্য এবার বিশ্বকাপ জেতা। এবং আমাদের এটা অর্জন করার প্রবল সুযোগ রয়েছে। কাজটা মোটাও সহজ নয় আমরা জানি, তবে আমরা চ্যাম্পিয়ন হতেই এখানে এসেছি।"

আমি ব্রাজিলিয়ান, তবে জাপান জিতলেও কষ্ট নেই- জিকো

বিশ্বকাপের মঞ্চে এটি দুই দলের মাত্র দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। এর আগে দীর্ঘ ২০ বছর আগে ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে মুখোমুখি হয়েছিল দল দুটি। সেবার ব্রাজিলের কাছে ৪-১ ব্যবধানে হেরেছিল জাপান, আর তখন জাপানের প্রধান কোচ হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিলেন খোদ জিকো!

দুই দেশের সাথেই জড়িয়ে আছে জিকোর নাড়ির টান। স্বভাবতই ম্যাচটি নিয়ে নিজের আবেগের কথা লুকাতে পারেননি তিনি,

"আমি অবশ্যই ব্রাজিলকে সমর্থন করব, কারণ দিনশেষে আমি একজন ব্রাজিলিয়ান। তবে জাপান যদি জিতে যায়, তাতেও আমার কোনো আক্ষেপ থাকবে না। আমি নিশ্চিত এটি একটি দুর্দান্ত ম্যাচ হতে যাচ্ছে, কারণ জাপান এখন সত্যিকারের আধুনিক ও সুন্দর ফুটবল খেলছে।"

সেই ২০০৬ সালের স্মৃতি রোমন্থন করে হাসতে হাসতে জিকো বলেন,

"সেবার আমাদের পরের পর্বে যেতে হলে ব্রাজিলকে ২ গোলে হারাতে হতো। আমরা ১-০ তে এগিয়েও গিয়েছিলাম, কিন্তু প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে রোনালদো নাজারিও হেড থেকে গোল করে সমতা ফেরে। রোনালদো নাকি আমাকে তার আদর্শ মানে! অথচ ও ওর ক্যারিয়ারের একমাত্র হেডের গোলটা দিয়েছিল আমারই দলের বিপক্ষে। তখনকার দলগুলোর অভিজ্ঞতা কম ছিল, কিন্তু আজকের জাপান অনেক পরিপক্ব।"

টোকওতে কয়েকমাস আগে ব্রাজিলকে হারিয়েছিল জাপান

জাপানের ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা ও মনস্তাত্ত্বিক পরিপক্বতা

২০০৬ সালে জাপান কেবল তাদের তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলছিল, আর এবার তারা নিয়মিত পরাশক্তি। ২০২৩ সাল থেকে ফিফা র‍্যাংকিংয়ের সেরা ২০-এর মধ্যে থাকা জাপানের এই অবিশ্বাস্য অগ্রগতির পেছনে ইউরোপীয় ফুটবলের বড় ভূমিকা দেখছেন জিকো,

"জাপান এখন অনেক বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ দল। আমাদের লাতিন আমেরিকার খেলোয়াড়দের মতোই জাপানি ফুটবলাররা এখন ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এবারের বিশ্বকাপে তাদের ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের ২৩ জনই খেলছে বুন্দেসলিগা, সেরি আ এবং ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের মতো জায়গায়।"

জিকো আরও যোগ করেন, জাপানের টেকনিক্যাল উন্নতির চেয়েও বড় পরিবর্তন এসেছে তাদের মানসিকতায়, 'অতীতে জাপানের মূল সমস্যা ছিল মনস্তাত্ত্বিক। তারা গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়লে  ভেঙে পড়ত। কিন্তু বর্তমান দলটি পরিস্থিতি সামাল দিতে জানে। গত কয়েক বছরে তারা ব্রাজিল, জার্মানি, স্পেন এবং ইংল্যান্ডের মতো পরাশক্তিদের হারিয়েছে। তারা এখন যে কারো মুখোমুখি হতে প্রস্তুত।"

দুই মিডফিল্ডার যখন ডাগআউটের মাস্টারমাইন্ড

জিকোর জন্য এই ম্যাচটি আরও এক কারণে বিশেষ, কারণ দুই দলের কোচই একসময় জিকোর খেলোয়াড়ি জীবনের প্রতিপক্ষ ছিলেন। জাপানের কোচ হাজিমে মোরিয়াসুর বিপক্ষে জিকো খেলেছেন জাপানি জে-লিগে, আর ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তির বিপক্ষে খেলেছেন ইতালিয়ান সেরি আ-তে।

উভয় কোচের প্রশংসা করে জিকো বলেন:

"আমার খুব ভালো মনে আছে, ওরা দুজনেই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ছিলেন। ভাগ্যিস, ওদের কেউই মাঠে নোংরা ফাউল করতেন না, দুজনেই খুব পরিচ্ছন্ন ও টেকনিক্যাল ফুটবলার ছিলেন। আর এই কারণেই মিডফিল্ড থেকে খেলা তৈরি করা দুই খেলোয়াড় আজ বিশ্বসেরা দুই কোচে পরিণত হয়েছেন এবং তারা মাঠের খেলাটা অন্যদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে পড়তে পারেন।"

সবচেয়ে বড় কাকতালীয় ব্যাপার হলো, যে ব্রাজিলের হাত ধরে জাপানি ফুটবলের এই উত্থান, সেই ব্রাজিলের হেক্সা (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ) মিশনের সামনেই এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তারা।