বাংলাদেশে ভেটেরিনারি (প্রাণী) চিকিৎসা ব্যবস্থায় ডিজিটাল রূপান্তরের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের প্রথম ডায়নামিক ভেটেরিনারি প্রেসক্রিপশন প্ল্যাটফর্ম ‘বায়োনাইট’ তৈরি করেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) এক শিক্ষার্থী। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চিকিৎসকেরা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নির্ভুলভাবে প্রাণীর রোগের ধরন ও ওজন অনুযায়ী ওষুধের সঠিক ডোজসহ স্বয়ংক্রিয় প্রেসক্রিপশন তৈরি করতে পারছেন।
মানুষের চিকিৎসার তুলনায় ভেটেরিনারি চিকিৎসা বেশি জটিল। এখানে গরু, ছাগল, ভেড়া, কুকুর, বিড়াল কিংবা হাঁস-মুরগিসহ ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর জন্য ভিন্ন ডোজ, রোগ এবং চিকিৎসা পদ্ধতি বিবেচনা করতে হয়। বিশেষ করে একটি ওষুধের ডোজ নির্ধারণে প্রাণীর সুনির্দিষ্ট ওজন, বয়স ও শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়াকে সহজ, দ্রুত এবং শতভাগ তথ্যনির্ভর করতেই উদ্ভাবিত হয়েছে ‘বায়োনাইট’।
এই যুগান্তকারী প্ল্যাটফর্মটির প্রতিষ্ঠাতা আনিসুর রহমান খান। তিনি বর্তমানে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের শেষ বর্ষের (লেভেল-৫, সেমিস্টার-১) শিক্ষার্থী। আনিসুর জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফার্ম অ্যানিমেল মেডিসিন’ কোর্স করার সময় তিনি দেখেন, একই ওষুধের ডোজ প্রাণীর ভিন্ন ভিন্ন ওজন অনুযায়ী বারবার হিসাব করতে হতো। এতে যেমন প্রচুর সময় অপচয় হতো, তেমনি মানুষের তৈরি ভুলের আশঙ্কাও থেকে যেত। আগে থেকেই প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি গভীর আগ্রহ থাকায় তিনি প্রযুক্তির মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান খোঁজার চেষ্টা শুরু করেন। সেই চিন্তা থেকেই ভেটেরিনারি চিকিৎসা ও তথ্যপ্রযুক্তিকে এক সুতায় গাঁথার উদ্যোগ নেন তিনি।
আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর বায়োনাইট যাত্রা শুরু করলেও এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রায় দেড় বছরের কঠোর পরিশ্রম, গবেষণা ও সফটওয়্যার উন্নয়নের গল্প। প্ল্যাটফর্মটির প্রযুক্তিগত নকশা ও কোডিংয়ের মূল কাজটি প্রতিষ্ঠাতা নিজেই করেছেন। তবে এর ভেতরে থাকা মেডিকেল ডেটা, ড্রাগ ডোজ ক্যালকুলেশন এবং চিকিৎসাবিষয়ক কনটেন্ট তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি সার্জনদের সরাসরি পরামর্শ ও সহায়তা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন স্বীকৃত ভেটেরিনারি ড্রাগ ম্যানুয়াল, আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন এবং ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির ড্রাগ নির্দেশিকাকে এর ডেটা সোর্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
বায়োনাইট প্রেসক্রিপশন মডিউলটি অত্যন্ত ব্যবহারকারী-বান্ধব। চিকিৎসকেরা প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করে প্রথমে প্রাণীর প্রজাতি, ওজন, পূর্বের রোগের ইতিহাস এবং বর্তমান ক্লিনিক্যাল লক্ষণগুলো ইনপুট করেন। এরপর প্ল্যাটফর্মটির এআই-ভিত্তিক সহায়ক ব্যবস্থা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য রোগ, ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের নিখুঁত ডোজসহ একটি পরামর্শপত্র প্রস্তুত করে দেয়।
এছাড়া চিকিৎসকেরা চাইলে ম্যানুয়ালি রোগ নির্বাচন করেও প্রেসক্রিপশন তৈরি করতে পারেন। প্রজাতি ও ওজনভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ডোজ ক্যালকুলেশন সুবিধার পাশাপাশি এতে চিকিৎসকদের সুবিধার্থে প্রেসক্রিপশন কাস্টমাইজেশন (ওষুধ যোগ বা বিয়োগ) করার সুযোগও রাখা হয়েছে। তবে অপব্যবহার ঠেকাতে রেজিষ্ট্রেশন প্রাপ্ত ভেটেরিনারি চিকিৎসা ব্যতীত অন্যকারো এক্সেস সীমিত করা হয়েছে।
উদ্দোক্তা জানান, বর্তমানে প্ল্যাটফর্মটি পরীক্ষামূলক ও সীমিত আকারে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহার করা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের মাঝে এটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং প্রায় ৬৮৩ বারের বেশি ড্রাগ রিডিং কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
ভবিষ্যতে নতুন ফিচার সংযোজন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার জন্য এটিকে সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক মডেলে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ভেটেরিনারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, অঞ্চলভিত্তিক রোগের প্রবণতা বিশ্লেষণ, ডেটা-চালিত রোগ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, ‘জুওনোটিক’ (প্রাণী থেকে মানুষে ছড়ানো রোগ) ঝুঁকি আগাম শনাক্তকরণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দ্রুতই এর অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস মোবাইল অ্যাপ বাজারে ছাড়া হবে।
এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জারি ও থেরিওজেনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি বায়োনাইটের ওয়েবসাইটটি পর্যবেক্ষণ করেছি। তরুণ শিক্ষার্থীর এই উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও কার্যকর মনে হয়েছে। এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে বিপুল মেধা ও শ্রম দিতে হয়েছে।
তবে এর কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়াতে ভবিষ্যতে অধিকতর যাচাই-বাছাই ও প্রতিনিয়ত ডাটা আপডেটের মাধ্যমে উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। আমি আশা করি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যাটফর্মটি আরও সমৃদ্ধ হবে এবং দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।’