দুর্নীতি নির্মূল

নজির সৃষ্টিকারী প্রতিবিধান চাই

আমরা জানি, দুর্নীতি হলো একটি সামাজিক ব্যাধি, যা ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে। একই সঙ্গে দেশ-জাতির উন্নয়ন-অগ্রগতির পথে সৃষ্টি করে প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতাও। দুর্নীতি দমন করা বা অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া কোনো কঠিন কাজ নয়, কিন্তু আসল সমস্যা হলো দুর্নীতিবাজদের তৈরি হওয়া সিস্টেম বা সমাজকে পরিবর্তন করা। এই কাজটি করতে আমাদের রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক প্রত্যেকটি সরকারেরই দৃঢ় অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির কথা আমরা শুনেছি, কিন্তু এর কাক্সিক্ষত রূপ দৃশ্যমান হয়নি, এরই চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে ২৫ জুন রাজধানীতে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে টিআইবির উপস্থাপিত জরিপ প্রতিবেদনে।

২৬ জুন দেশ রূপান্তরে ‘সেবা খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুর্নীতি ১২৬৩৩ কোটি’ শিরোনামে প্রতিবেদনে টিআইবির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে , ‘গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ২০২৫ সালেও দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হওয়া মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে ২০২৩ সালে যে পরিস্থিতি ছিল, তার তুলনায় ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেবা খাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা আরও বেড়েছে।’ ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে এক বছরে বিভিন্ন সেবা খাতে মোট ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারও দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে পারেনি। আমরা জানি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। সংগতই দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল, বহুমুখী সংস্কারের মধ্য দিয়ে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র-সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে ওই সরকার মানুষের প্রত্যাশার বিশেষ করে দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে সক্ষম হবে। কিন্তু টিআইবির অনুসন্ধানে যে চিত্র উঠে এসেছে তা অনভিপ্রেত। ২০২৫ সালে দেশের সেবাগ্রহীতাদের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন, যা ২০২৩ সালের জরিপে ছিল ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ। আমাদের অজানা নয়, দেশের কোনো কোনো সেবা খাতে ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন। টিআইবি বলছে, ‘বিচারিক সেবা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির উচ্চহার সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও ভূমি খাতের মতো জনসেবামূলক খাতগুলোতেও ঘুষের দৌরাত্ম্য মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে।’

২১ নভেম্বর ২০০৪ সালে জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি প্রতিরোধের মুখ্য রাষ্ট্রীয় সংস্থা দুদক আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে সংস্থাটি ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ নামে পরিচিত ছিল। দুদক রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত হয়ে কাজ করতে পারেনি এই অভিযোগ কম নয়। ২০০৯ সালে দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ড. গোলাম রহমান প্রথম প্রতিষ্ঠানটিকে ‘দন্তহীন বাঘ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে দায়িত্ব ছাড়ার আগে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, দুদক একটি ‘নখদন্তহীন বাঘ’। তার ওই বক্তব্য দুদকের অক্ষমতা তুলে ধরেছিল। অতীতে আইনি সীমাবদ্ধতা, সরকারের হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং মামলার ধীরগতির কারণে কমিশনকে ক্ষমতাহীন ও কার্যকরহীন করে রাখা হয়েছে বলে বারবার অভিযোগ উঠলেও, সরকার এর প্রতিবিধান করতে পারেনি। যে সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বড় রকমের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল এবং সেই দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু করল যে সংস্থাটি, বছর পেরোতে না পেরোতেই সেই সংস্থারই মাথার ওপরে নাজেল হয়েছিলেন সেই ‘দুর্নীতিবাজ’ কর্মকর্তা, এমন কদাচারের নজিরও আমাদের সামনে আছে। সর্ষের ভেতর ভূত রেখে সেই সর্ষে দিয়ে ভূত তাড়ানোর আশা যে দুরাশার নামান্তর, এরও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নি®প্রয়োজন। টিআইবির জরিপে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা খতিয়ে দেখে সরকারকে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার নিশ্চিতের বিকল্প নেই। প্রশাসনিক সংস্কার তো বটেই, একই সঙ্গে দুদকের কার্যকর ও স্বাধীন কর্মপদ্ধতি নিশ্চিত করা না গেলে সুফল মিলবে না। এ নিয়ে কথা হয়েছে বিস্তর, এবার আমরা কাজের কাজ দেখতে চাই। দুর্নীতিবাজরা যেন কোনো অনুকম্পা না পান, তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নজির সৃষ্টিকারী প্রতিবিধানের পথ সুগম করুন। এর জন্য চাই সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার।