নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সবার মধ্যেই একটা স্বাভাবিক কৌতূহল থাকে সরকারপ্রধানের প্রথম বিদেশ সফরকে ঘিরে। কোথায় প্রথম সফরটি হতে যাচ্ছে, এ নিয়ে নানা প্রশ্ন যখন জনমনে, মালয়েশিয়া দিয়ে শুরু করে চীনের বেইজিংয়ে শেষ করে সরকারের পক্ষ থেকে একটা জুতসই জবাব দেওয়া হলো। মালয়েশিয়া এবং চীন কেবল এশিয়ার দেশই নয়, বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের শুরু থেকেই দেশ দুটির সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে সহযোগিতার ধারা বিরাজ করেছে। এর মধ্যে একটি দেশ আমাদের জনশক্তিকে নিজেদের উন্নয়নে কাজে লাগিয়েছে, লাখ লাখ লোকের সেদেশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশে এসেছে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স এবং অপরটি আমাদের অভ্যন্তরীণ ধারাবাহিকভাবে, আর্থিক এবং কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। বিশে^র যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত এই দেশ দুটি নিঃসন্দেহে অগ্রগণ্য।
২১ জুন মালয়েশিয়া দিয়ে শুরু হওয়া সফরে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফরটি সেদেশের জন্যও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এতে মালয়েশিয়া সরকার নিজেকে যেমন সম্মানিত ভেবেছে, আমাদের জন্যও শ্রমশক্তির বাইরে নতুন কিছু বিষয় নিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সফরটি শেষ হয়েছে ১৪টি চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারকের মধ্য দিয়ে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে বিস্তৃত করার অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এ নিয়ে অতীতে খুব একটা এগোনো যায়নি। সেই সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলোতে এবার কাজ করতে চাচ্ছে দুই দেশই। এই সুযোগে বাংলাদেশের পক্ষ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে কিছু প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে মালয়েশিয়ার কাছে। এসবের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং ওষুধ শিল্পের মতো জায়গায় মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ এবং এসব পণ্য সেদেশে রপ্তানির পরিবেশ সৃষ্টি করা। তুলনামূলক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ কেন এসব ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার জন্য ভালো পছন্দ হতে পারে, সে সব যুক্তিও উত্থাপন করা হয়েছে।
স্বল্প সময়ের সফরে দুই দেশই এটা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে যে, বাংলাদেশের সঙ্গে কেবল শ্রমবাজার কিংবা সহায়তা প্রদানের গ-ির মধ্যে আবদ্ধ থাকার নয়, বরং এটিকে ছাপিয়ে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। মালয়েশিয়া সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের তরফ থেকে যে বার্তাটি পৌঁছে দেওয়া শুরু হলো, আপাতত চীন সফরের মধ্য দিয়ে এর সমাপ্তি ঘটেনি, বরং নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি ভিন্ন উপস্থাপনা এর মধ্য দিয়ে টের পাওয়া যাচ্ছে। এসবের বাইরে সরকার চাইছে উক্ত দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে একটি সম্মানজনক এবং পারস্পরিক স্বার্থ সংরক্ষণের জায়গায় নিয়ে আসতে। সে লক্ষ্যে শ্রমবাজারের বাইরে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি কমাতে সেদেশের সরকারের কাছে একরাশ প্যাকেজ পেশ করা হয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে পামঅয়েল, সেমি কন্ডাক্টর ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্যের অন্যতম ক্রেতা বাংলাদেশ। দেশটির সঙ্গে ৩ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সম্পর্কের লাভের পাল্লাটি মালয়েশিয়ার দিকেই ঝুঁকে রয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এসবকে সহজলভ্য করা এবং আমাদের দেশের একটা বড় অংশের মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সেদেশের সরকারকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা মালয়েশিয়ার বিবেচনাধীন রয়েছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, সিরামিক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক সামগ্রী এবং ওষুধের মতো খাতগুলোকে মালয়েশিয়ায় রপ্তানির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে সেদেশের কাছে প্রস্তাব আকারে তুলে ধরে হয়েছে। বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে দুদেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য প্রতিষ্ঠায় ২০২৭ সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। মালয়েশিয়া হয়ে চীন সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরেছেন। বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে চীনের পক্ষ থেকেও উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে সেদেশের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে
থাকার ব্যবস্থা করেছে চীন সরকার। সফরের শেষটি ছিল উল্লেখ করার মতো। ২৫ জুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং এবং ২৬ জুন সকালে চীনের প্রেসিডেন্টের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের আগেই দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদ্বয়ের সম্মতিতে স্বাক্ষরিত হয় ১৩টি সমঝোতা স্মারক। এই সমঝোতা স্মারকের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হচ্ছে শিক্ষা ও দক্ষতা, চিকিৎসা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সবুজ এবং টেকসই উন্নয়ন, বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র এবং তথ্য বিষয়ক সহযোগিতা আদান-প্রদান ইত্যাদি বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এবার বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে চীনের দালিয়ান শহরে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক অলাভজনক এই ফোরামটির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে অভিন্ন বৈশি^ক সমস্যাগুলোকে মোকাবিলা করে পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ককে বাড়ানো। বিশে^র অসংখ্য রাষ্ট্র এবং সরকারপ্রধান এতে যোগ দিয়েছে। এটিকে উপলক্ষ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর যোগদান এবং সম্মেলন শেষ করে চীনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ রক্ষা করতে বেইজিং গমন আমাদের জন্য চমৎকার একটা কূটনৈতিক কৌশল। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান সৌহার্দ্যরে সম্পর্ককে নতুন সরকারের কৌশল অনুযায়ী কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, সে লক্ষ্যে দুই সরকারের কাছেই নতুন করে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হলো। বাংলাদেশের সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের অব্যাহত মাত্রার বাণিজ্যিক সম্পর্কের পথ ধরে সাম্প্রতিক সময়ে এমন কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে আগামী দিনগুলোতে এদেশে যেমন প্রচুর চীনের বিনিয়োগ আসবে, বাংলাদেশের বাজারকেও চীনে আরও সম্প্রসারণ করার সুযোগ করে দেবে। আগে থেকেই চীনের বাজারে বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুযোগ থাকলেও আমাদের উৎপাদন এবং মান নিয়ন্ত্রণে দক্ষতার অভাবে সেটা ভালোভাবে কাজে লাগানো যায়নি। এর ফলে চীন থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশের রপ্তানিও মাত্র ৭শ মিলিয়ন ডলার।
চীন সরকার ইতিমধ্যে সেদেশের ৩০টি শহরে বাংলাদেশের জন্য ৩০টি আউটলেটের অনুমোদন দিয়েছে, যেখানে কেবল বাংলাদেশি পণ্যের প্রদর্শন এবং বিক্রির ব্যবস্থা থাকবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারা, খুলনার মোংলা, ঢাকার কেরানীপঞ্জে চীনের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক এবং শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে আনোয়ারার অঞ্চলটি হতে যাচ্ছে সর্ববৃহৎ; ৮শ একর ভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং এর অনুকূলে ১৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। চীনের পক্ষ থেকেও ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরে এ উপলক্ষে বিডার আয়োজনে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক বিনিয়োগ সম্মেলনে চীনের ব্যবসায়ীদের কাছে বাংলাদেশের অনুকূল পরিবেশের দিকটিকে তুলে ধরা হয়।
চীনের প্রধানমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহাদি আমির সংবাদ সম্মেলনে জানান, দুই দেশের সরকারই বাংলাদেশের চলমান উন্নয়নমূলক নানা কর্মকা-ের ব্যাপ্তি আরও বাড়াতে চায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির মধ্যে সড়ক, সেতু এবং রেলওয়ের উন্নয়নে আরও উল্লেখযোগ্য চীনা সহায়তা পাওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেছে। সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয় যে, বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে চীনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত না হলেও সেদেশের সরকারের পক্ষ থেকে পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে এর পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং কারিগরি ক্ষেত্রে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। বাংলাদেশের জ¦ালানি এবং বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানেও চীন পাশে থাকতে চায় বলে জানানো হয়েছে। বাংলাদেশকে ব্রিকসের সদস্যপদ প্রাপ্তির বিষয়েও চীনের সমর্থনের বিষয়টি সেদেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে। এটি করা সম্ভব হলে আমাদের পক্ষ্যে আরও বৃহত্তর পর্যায়ে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অন্বেষণে কাজ করা সম্ভব।
২৪ জুন বিডার আয়োজনে বেইজিংয়ে ১২৫ বিনিয়োগকারী অংশ নেন, যেখানে বাংলাদেশ সরকার থেকে চীনের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ আরও সহজ করতে বেইজিংয়ে একটি বিনিয়োগ কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই বিনিয়োগ সম্মেলনে চীনের বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক এবং প্রশাসনিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের যাত্রাপথের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি।’ তিনি আরও জোর দিয়ে বাংলাদেশকে পরবর্তী এশীয় অর্থনীতির বিস্ময় হিসেবে অভিহিত করে এটি রচনায় অংশীদার হতে চীনের বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানান। চীনের বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় বেইজিংয়ে প্রতিষ্ঠিতব্য বিনিয়োগ কার্যালয়ের মাধ্যমে ১৫ দিনের মধ্যে লাইসেন্স প্রদানের নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়। চীনের বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম, মোংলা এবং আড়াইহাজারের মতো জায়গায় বিশেষ অর্থনৈতিক এবং শিল্পাঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের উদ্যোগে চীনের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়েছে।
শ্রমশক্তি রপ্তানি এবং সাহায্যনির্ভরতাকে কাটিয়ে নিজেদের সামর্থ্যকে কীভাবে কাজে লাগিয়ে কাক্সিক্ষত উন্নয়নের পথে অগ্রসর হওয়া যায়, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল এটাই। সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্বের পর মালয়েশিয়া এবং চীনে তার এই প্রথম আনুষ্ঠানিক সফরটি ছিল বেশ পরিকল্পিত এবং গোছানো। বৈশি^ক রাজনীতির নানা মেরুকরণের মধ্য থেকে কূটনৈতিক পন্থায় কীভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি রক্ষা করে আগামী দিনে অগ্রসর হওয়া যায়, এটি তার একটি সূচনা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
লেখক : কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক। অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।