বর্তমান বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির (টেকনোলজি-বেইসড নলেজ ইকোনমি) দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, অটোমেশন, বিগ ডেটা, নবায়নযোগ্য জ¦ালানি, সবুজ অর্থনীতি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বিভিন্ন প্রযুক্তি বিশ্ব শ্রমবাজারের কাঠামোকে আমূল পরিবর্তন করছে। ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ক্রমে এমন দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, যা প্রচলিত শিক্ষার গণ্ডি অতিক্রম করে সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান, ডিজিটাল সাক্ষরতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং আজীবন শেখার সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের নিশ্চয়তার পাশাপাশি গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি এবং দক্ষ শিক্ষক প্রস্তুতির উদ্যোগ। বাংলাদেশের জন্য এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী যথাযথ শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেলে দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে। কিন্তু যদি তাদের আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ অর্থনীতি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী জ্ঞান ও দক্ষতায় শিক্ষিত করা না যায়, তাহলে এই সম্ভাবনাময় ‘জনসংখ্যাগত বোঝা’ রূপ নিতে পারে।
সমাজবিজ্ঞানীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সামাজিক সংহতি ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইমের মতে, শিক্ষা সমাজের অভিন্ন মূল্যবোধ, নৈতিক আদর্শ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ নতুন প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত করে। অন্যদিকে অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও সামাজিক বঞ্চনা প্রায়ই অপরাধ, সহিংসতা, উগ্রবাদ এবং সামাজিক অস্থিরতার উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে। যে সমাজে মানসম্মত শিক্ষা বিস্তৃত হয়, সেখানে নাগরিকরা অধিকতর আইনমান্যকারী, সহনশীল এবং গণতান্ত্রিক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ফলে শিক্ষায় বিনিয়োগকে কেবল একটি উন্নয়নমূলক উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তা ও জাতীয় স্থিতিশীলতার কৌশল হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত। এ কারণেই শিক্ষায় বিনিয়োগের সুফল কখনোই শিক্ষা খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ইতিবাচক প্রভাব স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবার পরিকল্পনা, নারী ক্ষমতায়ন, সামাজিক সম্প্রীতি, উৎপাদনশীলতা, আইনশৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় সেবার গুণগত মান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। শিক্ষায় ব্যয়িত প্রতিটি অর্থ রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রতিফলন সৃষ্টি করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করাই চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং সেই বরাদ্দের কার্যকর, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা হলো পরিকল্পনার ধারাবাহিকতার অভাব, প্রকল্পভিত্তিক চিন্তার আধিক্য, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং গুণগত মানের প্রশ্নে দীর্ঘস্থায়ী উদাসীনতা। ফলে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও যদি তার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হয়, কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রাষ্ট্রীয় অর্থের নয়ছয়ে শুভংকরের ফাঁকিটাই প্রধান হয়ে ওঠে, তবে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করা সম্ভব হবে না। এ জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, নৈতিক ও নাগরিক শিক্ষা শক্তিশালীকরণ এবং প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সমতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি অনেক ক্ষেত্রে জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বিকাশের পরিবর্তে পরীক্ষাকেন্দ্রিক সনদ অর্জনের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়লেও দক্ষ ও উদ্ভাবনী মানবসম্পদের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে তা কেবল চাকরিপ্রার্থী তৈরি না করে; বরং সমস্যা সমাধানে সক্ষম, প্রযুক্তি-সচেতন, উদ্ভাবনী, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করে। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে কতজন মানুষ চাকরি খুঁজছে তার ওপর নয়; বরং কতজন মানুষ নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে, নেতৃত্ব দিতে এবং সমাজের কল্যাণে ইতিবাচক অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে তার ওপর। অতএব শিক্ষায় অধিক বরাদ্দ এবং সেই বরাদ্দের কার্যকর ব্যবস্থাপনা- এই দুটি বিষয়কে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত, সম্পদ স্বল্প কিংবা ভৌগোলিকভাবে সীমাবদ্ধ অনেক দেশও শিক্ষায় ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে যেসব রাষ্ট্র শিক্ষাকে অবহেলা করেছে, সেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং জাতীয় ঐক্য দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইতিহাস তাই বারবার প্রমাণ করেছে যে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান দ্বারা। টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো শিক্ষা। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ যত বাড়বে দেশ-জাতির বিকশিত হওয়ার পথ ততই সুগম হবে।
বর্তমান বিশে^ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদে নয়, বরং তার মানবসম্পদে নিহিত। একটি দেশের সড়ক, সেতু বা অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার নাগরিকদের জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের ওপর। যে জাতি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়, সেই জাতিই টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সুশাসনের পথে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রসংস্কার, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের যে জনআকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন জ্ঞানসমৃদ্ধ, দক্ষ, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ। আর সেই নাগরিক সমাজ গঠনের প্রধান ভিত্তি হলো একটি মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা। তাই শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং জনশক্তির চাহিদাভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
mahruf@ymail.com