মৃত্যুর আগে মনের কথাগুলোই আত্মজীবনীতে লিখেছি

কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের আজ ৮৫তম জন্মদিন। ১৯৪১ সালের ২৮ জুন পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারে জন্ম নেওয়া এই সুরসম্রাজ্ঞী সাত দশক ধরে সুরের মায়াজালে বেঁধে রেখেছেন বাঙালিকে। বাবা লোকসংগীতের প্রবাদপুরুষ আব্বাসউদ্দীন আহমদের হাত ধরে গানে হাতেখড়ি হওয়া এই শিল্পী ধ্রুপদি, নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত থেকে শুরু করে আধুনিক ও চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকে তৈরি করেছেন নিজস্ব এক সাম্রাজ্য। বিটিভির উদ্বোধনী দিনের প্রথম কণ্ঠ কিংবা ‘এসো গান শিখি’র প্রিয় ‘খালামণি’। সব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি এ দেশের এক জীবন্ত ইতিহাস। জন্মদিন উপলক্ষে কথা হয় গুণী এই শিল্পীর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারেক আনন্দ

কেমন আছেন? শরীর কেমন যাচ্ছে আপনার?

শরীর কিছুটা খারাপ, একটু অসুস্থ আছি। আপনারা তো জানেনই, বয়স হয়েছে, শরীরটা এখন আর আগের মতো সায় দেয় না। এর মধ্যেই দিন চলে যাচ্ছে।

আজ আপনার জন্মদিন, জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছি আপনাকে।

ও আচ্ছা আচ্ছা। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমার জন্য দোয়া করবেন।

আপনার জন্য সবসময়ই আমাদের অন্তহীন দোয়া। আজ এই বিশেষ দিনে, বিশেষ করে যারা আপনার শুভাকাক্সক্ষী, ভক্ত  তাদের উদ্দেশ্যে কী বলবেন?

আমি সত্যিই খুব খুশি যে, আমার জন্মদিন উপলক্ষে আপনারা আমাকে মনে রেখেছেন, শুভকামনা জানাচ্ছেন। আমি অত্যন্ত আনন্দিত এবং একই সঙ্গে গর্বিত যে, আমার শ্রোতারা আমাকে ভালোবেসে এখনো হৃদয়ে রেখেছেন। সত্যি বলতে, আমাদের জেনারেশনের অনেক শিল্পীকে তো এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এখন ভুলেই বসতে চলেছে। সেখানে এই যুগের ছেলেমেয়েরা যে এখনো আমাকে মনে রেখেছে, আমার জন্মদিনের কথা স্মরণ করে শুভেচ্ছা জানায়, এটা আমার একটা বিরাট সৌভাগ্য।

আপনার এই দীর্ঘ পথচলায় তো অনেক প্রজন্মকে কাছ থেকে দেখেছেন। এই প্রজন্মের প্রতি আপনার অনুভূতি কেমন?

আসলে আমাদের সময়ে যারা শ্রোতা ছিলেন, সমসাময়িক ছিলেন, তারা তো আমাকে স্মরণ করবেনই, মনে রাখবেনই। কিন্তু এই যে তারপরের জেনারেশন, যাদের আমি এত বছর ধরে ‘খালামণি’ সম্বোধন করে আদর দিয়ে এসেছি, ভালোবেসে এসেছি, তাদের সঙ্গে আমার প্রায় ৬০ বছরের একটা সম্পর্ক। সুতরাং ওদের জন্য আমার মনের ভেতর একটা আলাদা মায়া, আলাদা মমতা আর ভালোবাসা রয়েছে। সেই ক্যাটাগরির ছেলেমেয়েরা যখন আমাকে ভালোবাসা জানায়, শ্রদ্ধা জানায়, তখন আমার মনে হয় এটা আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয় এবং এক বিরাট প্রাপ্তি। আমি দোয়া করি, আপনাদের সবার ভালো হোক। আল্লাহ আপনাদের সবাইকে ভালো রাখুন।

বর্ণাঢ্য জীবনে একে একে অনেক সহকর্মী ও গুণী মানুষকে হারিয়েছেন। এ সময়ে এসে কি কখনো একাকিত্ব বা খারাপ লাগা কাজ করে?

সেই খারাপ লাগাটা কি স্বাভাবিক নয় বাবা? কিছুটা তো লাগেই। একসঙ্গে কাজ করা কত মানুষ আজ আর নেই। তবে ওই খারাপ লাগার পর যখন আবার সামনের দিকে তাকাই, তখন ভাবি, প্রত্যেকেই তো পৃথিবীতে আল্লাহর একটা নির্দিষ্ট দিন নিয়ে এসেছে। আল্লাহ যার যতটুকু সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন, সে পৃথিবীতে ঠিক ততটুকুই সময় পাবে, তার এক সেকেন্ড বেশিও নয়, কমও নয়। এই উপলব্ধি থেকেই কিন্তু আমি একাকিত্বের মধ্যেও কিছুটা কাজ করে ফেলেছি।

আমাদের জন্য নিশ্চয়ই সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে। কী কাজ করলেন এ সময়ে?

এর মধ্যে আমি চেষ্টা করেছি আমার আত্মজীবনীটা লিখে ফেলার। আলহামদুলিল্লাহ, লিখে শেষ করতে পেরেছি। ‘প্রথমা’ থেকে প্রকাশ হচ্ছে। আগামী ৭ তারিখে প্রকাশনা উৎসব হবে। একাকিত্বের মধ্যেও যে আমি শক্তি সঞ্চয় করে এই কাজটা শেষ করতে পেরেছি, সেজন্য আল্লাহর কাছে অনেক শুকরিয়া আদায় করি। আপনাদের সবার দোয়া কাম্য।

আপনার মতো একজন কিংবদন্তির বর্ণাঢ্য জীবনের গল্প জানতে পারব। আত্মজীবনীর নাম কী রেখেছেন?

আত্মজীবনীর নাম দিয়েছি ‘লোকে বলে প্রেম আমি বলি জ¦ালা’।

খুব সুন্দর নাম। ভীষণ চমৎকার।

পছন্দ হয়েছে আপনার?

জি, খুবই দারুণ। এটি কি তাহলে আগামী মাসের ৭ তারিখেই প্রকাশ পাচ্ছে?

৭ তারিখেই প্রকাশ হচ্ছে। প্রথমা প্রকাশন থেকে বের হচ্ছে। আপনারা সবাই পড়বেন কিন্তু। আপনারা পড়ে আমাকে বলবেন, আপনাদের ভালো লেগেছে নাকি খারাপ লেগেছে। আমার জীবনে যা মনে হয়েছে, আমি ঠিক তাই লিখেছি। মৃত্যুর আগে মনের কথাগুলো সুন্দরভাবে লিখে, সেটাকে বই আকারে ছাপিয়ে যেতে পারলাম, সেজন্য আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া।

আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি আপনার এই বইটির জন্য। আপনার এই দীর্ঘ কর্মময় জীবন, এত গুণী মানুষের সান্নিধ্য পাওয়ার গল্পগুলো আমাদের জন্য সত্যিই এক বিরাট পাওয়া।

আমি সত্যিই ভীষণ খুশি। একটু আগে যেটা বললাম, এই জেনারেশনের ছেলেমেয়েরা যে আমার কথা মনে রেখেছে, এই বয়সে এসেও আমাকে নিয়ে ভাবছে, এটা আমার জন্য যে কী পরিমাণ আনন্দের, তা অল্প কথায় বোঝানো যাবে না। এটা আমার জন্য বিরাট আনন্দের এক ব্যাপার। আমি সবসময় বলি, পুরনো যারা, তারা তো আমাদের গান ভালোবাসবেই। কিন্তু আপনারা যারা ছোট, এই নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যখন আমার জন্মদিনে শুভেচ্ছা নিয়ে খোঁজ নেন, তখন সেটা আমার জীবনে সত্যি একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকে। অনেক ধন্যবাদ, বাবা। ভালো থাকবেন।