ইরানের উৎসব ছিনিয়ে নিল মিসর

ঘড়ির কাঁটায় তখন ৯৩ মিনিট। সিয়াটল স্টেডিয়ামজুড়ে তখন বাঁধভাঙা উল্লাস। গোল করে উন্মাদের মতো জার্সি খুলে হাঁটু গেড়ে সøাইড করছেন ইরানি ডিফেন্ডার শুজা খলিলজাদেহ। ডাগআউট থেকে পুরো দল ছুটে এসেছে মাঠে, গ্যালারি থেকে এক সমর্থক নিরাপত্তারক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে জড়িয়ে ধরেছেন প্রিয় তারকাকে। সাইডলাইনে তখন এক ইরানি কর্মকর্তা আনন্দের আতিশয্যে অজ্ঞান প্রায়।

দৃশ্যপট দেখে যে কেউ বাজি ধরে বলতেন ইতিহাস গড়ে ফেলেছে ইরান। কিন্তু ফুটবল মাঠের নির্মম সত্যটা অন্য কোথাও লেখা হচ্ছিল। পোলিশ রেফারি সাইমন মারচিনিয়াক যখন ভিএআর স্ক্রিনের দিকে হাঁটলেন, পুরো স্টেডিয়ামে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। স্ক্রিনের প্রযুক্তিতে ধরা পড়ল, বল পাস হওয়ার মুহূর্তে খলিলজাদেহ মাত্র কয়েক মিলিমিটারের ব্যবধানে অফসাইডে ছিলেন। সেকেন্ডের ব্যবধানে আকাশছোঁয়া স্বপ্ন আছড়ে পড়ল বাস্তবের রূঢ় মাটিতে। গোল বাতিল! ইরানের মহাকাব্যিক জয়ের আনন্দ কর্পূরের মতো উড়ে গিয়ে রূপ নিল সীমাহীন বিষাদে।

শেষ মুহূর্তের এমন অবিশ্বাস্য সব নাটকীয়তা, পেনাল্টি মিস আর একের পর এক শট পোস্টে লাগার পর ১-১ গোলের রোমাঞ্চকর ড্র নিয়ে মাঠ ছেড়েছে ইরান ও মিসর। তবে এই ড্রয়ের মধুর স্বাদ পুরোপুরি পেয়েছে ফারাওরা। ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘জি’-এর রানার্স-আপ হিসেবে শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে তারা। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ৯২ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে খেলার গৌরব অর্জন করল মিসরীয়রা, যার আগে কেবল ১৯৩৪ সালের প্রথম বিশ্বকাপে এই কীর্তি ছিল তাদের। অন্যদিকে, ৩ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তিনে থাকা ইরানকে এখন বেঁচে থাকতে হচ্ছে এক চরম অনিশ্চিত অপেক্ষায়।

ম্যাচের শুরুটা অবশ্য ছিল একেবারেই ভিন্ন। মাত্র ৫ মিনিটের মাথায় মিসরীয় জাদুকর মোহামেদ সালাহর বাঁ পায়ের দারুণ এক আক্রমণ থেকে বল পেয়ে মাহমুদ সাবের গোল করে মিসরকে এগিয়ে নেন। তবে পার্সিয়ানরা জবাব দিতে খুব একটা সময় নেয়নি। ম্যাচের ১৪ মিনিটেই রামিন রেজাইয়ান এক কঠিন কোণ থেকে বুলেট গতির শটে বল জালের ছাদে পাঠিয়ে ইরানকে ১-১ সমতায় ফেরান। প্রথমার্ধেই লিড নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল ইরান, যখন বক্সের ভেতর ফাউলের শিকার হয়ে পেনাল্টি জেতেন মেহদি তারেমি। কিন্তু তারেমির দুর্বল শটটি দারুণ দক্ষতায় রুখে দেন মিসরের বাজপাখি গোলরক্ষক মোস্তফা শোবের।

দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ কিছুটা ধীরগতির হয়ে পড়লেও আসল রোমাঞ্চ জমা ছিল শেষ মুহূর্তের জন্য। ৮৯ মিনিটে তারেমির দুর্দান্ত হেড মিসরের ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। এরপর ৯৩ মিনিটের সেই বাতিল হওয়া গোলের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই, ৯৮ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় জাহানবখশের আরও একটি হেড কপাল পুড়িয়ে দেয় ইরানের। এবারও বল প্রতিহত হয় ক্রসবারে।

প্রতি ম্যাচেই লড়াইয়ে দারুণ ছাপ রেখে গেলেও ৩টি ম্যাচেই ড্র করে জয়ের দেখা না পাওয়া ইরানি কোচ আমির ঘালেনোই ম্যাচ শেষে ভাগ্যের দোহাই দিয়ে আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই তিনটি ম্যাচে আমরা আমাদের কষ্টের সঠিক পুরস্কার পাইনি। ফুটবলের বিচার আজ আমাদের পক্ষে ছিল না।’

এদিকে ম্যাচের ৬০ মিনিটের দিকে মাঠ ছাড়ার সময় মিসরীয় অধিনায়ক সালাহর পায়ে বরফ (আইসপ্যাক) বাঁধতে দেখা যাওয়ায় ফারাও শিবিরে কিছুটা উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তবে কোচ হোসাম হাসান আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, সালাহর চোট গুরুতর নয় এবং নকআউটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগেই তিনি পুরোপুরি ফিট হয়ে উঠবেন।

ইরানের নকআউটের জটিল সমীকরণ

গ্রুপের অন্য ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৫-১ ব্যবধানে উড়িয়ে গোল ব্যবধানে (৪+) মিসরের চেয়ে এগিয়ে থেকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে উঠেছে বেলজিয়াম। তবে ৩ পয়েন্ট ও শূন্য গোলগড় নিয়ে ইরান এখনো টুর্নামেন্টে টিকে আছে চাতক পাখির মতো। শেষ ৩২-এর টিকিট নিশ্চিত করতে পার্সিয়ানদের এখন তাকিয়ে থাকতে হবে বাকি তিন গ্রুপের জটিল অঙ্কের দিকে। শেষ আটের সেরা তৃতীয় দল হিসেবে নকআউটে যেতে হলে ইরানকে অন্তত একটি সমীকরণ মিলতে হবে। যেখানে প্রথমত, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ঘানাকে জয়ী হতে হবে; দ্বিতীয়ত, কঙ্গোর সঙ্গে ম্যাচে উজবেকিস্তানকে অন্তত ড্র বা জয় তুলে নিতে হবে। তৃতীয়ত, অস্ট্রিয়া বনাম আলজেরিয়া ম্যাচটি ড্র না হয়ে যেকোনো এক দল স্পষ্ট ব্যবধানে জিতলেই চলবে। এর মধ্যে যদি অস্ট্রিয়া আলজেরিয়াকে হারিয়ে দেয়, তবে অন্য কোনো হিসাব ছাড়াই সরাসরি শেষ ৩২-এ পা রাখবে ইরান।