নেপথ্যের নায়কের হ্যাটট্রিক

যুক্তরাষ্ট্রের লেখক ফ্রাঙ্ক সোনেনবার্গ তার এক বিখ্যাত উক্তিতে বলেছিলেন, ‘নেপথ্যের নায়করা তাদের প্রাপ্য কৃতিত্বটুকু পায় না। কারণ তারা চিরকাল অন্যের ছায়ায় বাস করে।’ বোস্টন স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসা ৬৪ হাজার দর্শকের মনস্তত্ত্বও ছিল ঠিক তেমন। ফ্রেঞ্চ জাদুকর কিলিয়ান এমবাপ্পে বনাম নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন আর্লিং হালান্ডের মধ্যকার এক চরম দ্বৈরথ দেখার টিকিট কেটেছিলেন তারা। কিন্তু সোনেনবার্গের সেই উক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাঝেমধ্যে এমন কিছু চরিত্রের রাজকীয় উত্থান হয়, যারা অন্যের ছায়া থেকে বেরিয়ে পুরো আলো নিজের দিকে কেড়ে নেন। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের রাতে ঠিক সেই কাজটিই করলেন উসমান দেম্বেলে। গ্যালারি যখন দুই প্রধান চরিত্রের মহাকাব্যিক লড়াই দেখার অপেক্ষায় বিভোর, তখন বোস্টনের সবুজ গালিচায় চলল নিখাদ এক ‘ওয়ান ম্যান দেম্বেলে শো’। নরওয়েকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে গ্রুপ ‘আই’-এর শীর্ষস্থান নিশ্চিত করার রাতে ফরাসি এই উইঙ্গার যেন একাই ছাড়িয়ে গেলেন সব চেনা চিত্রনাট্যকে।

ম্যাচের আগে নরওয়ে কোচ স্টালে সোলবাকেন বড় এক চাল চালেন। ইতিমধ্যে নকআউট নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় তিনি দলের সেরা একাদশের ১০ খেলোয়াড়কেই বিশ্রামে পাঠান, যার মধ্যে ছিলেন গোলমেশিন হালান্ড এবং অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড। ফলে হালান্ড-এমবাপ্পে শোর আশা শুরুতেই মার খায়। তবে মাঠের ফ্রান্স দলটিকে দেখে মনে হচ্ছিল, তারা প্রতিটি মুহূর্তের ফায়দা তুলতে বদ্ধপরিকর।

ম্যাচ শুরুর মাত্র ২৫ সেকেন্ডের মাথায় এমবাপ্পের শট বারে লেগে ফিরে এলে নরওয়ে শিবিরে কাঁপুনি ধরে। এর ঠিক ৬ মিনিট পর শুরু হয় উসমান দেম্বেলের সেই জাদুকরী ২৫ মিনিট। ম্যাচের ৭, ২০ ও ৩২ মিনিটে মাত্র ২৫ মিনিটের ব্যবধানে নরওয়ের দ্বিতীয় সারির রক্ষণভাগকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক তুলে নেন এই পিএসজি তারকা। এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম হ্যাটট্রিক, যা ১৯৫৪ সালে চেকোসেøাভাকিয়ার বিপক্ষে অস্ট্রিয়ার এরিখ প্রবস্টের ২৪ মিনিটের রেকর্ডের ঠিক পরপরই জায়গা করে নিয়েছে।

দেম্বেলের এই অবিশ্বাস্য ফর্ম ফরাসি শিবিরের জন্য এক বিরাট স্বস্তি। বিগত দুটি বিশ্বকাপে (২০১৮ ও ২০২২) ১১ ম্যাচ খেলেও কোনো গোল না পাওয়া এই উইঙ্গারের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ ফরাসি সংবাদমাধ্যমেই তুমুল সমালোচনা চলছিল। দেশের জার্সিতে ৬১ ম্যাচে মাত্র ৮ গোল করা এই উইঙ্গার ক্লাব ফুটবলের ফর্ম কেন জাতীয় দলে দেখাতে পারেন না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছিল একরাশ প্রশ্ন। কিন্তু চলমান বিশ্বকাপে ইরাকের বিপক্ষে খাতা খোলার পর নরওয়েকে একাই ধসিয়ে দিয়ে দেম্বেলে এখন ৪ গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের পাশেই নিজের নাম লিখিয়েছেন।

জুঁস ফন্তেইন ও এমবাপ্পের পর তৃতীয় ফরাসি হিসেবে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিকের কীর্তি গড়া দেম্বেলে ম্যাচ শেষে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘এটি সত্যিই এক অনন্য ও বিশেষ মুহূর্ত। তবে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল গ্রুপ পর্বে প্রথম স্থান বজায় রেখে শেষ করা। আমরা এখন শেষ ৩২-এর ম্যাচ নিয়ে ভাবছি, যা আমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

নিজের এই আগুনে ফর্মের পরও কোনো ব্যক্তিগত অহংকারে ভেসে যাননি গত বছরের ব্যালন ডি’অর জয়ী এ তারকা। টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা আমাদের প্রতিটি ম্যাচই জিততে চাই, তবে একই সঙ্গে নিজেদের ফোকাস ধরে রাখা জরুরি। আমাদের সামনে অনেক বড় বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য রয়েছে, তাই আমাদের শতভাগ মনোযোগ ধরে রাখতে হবে।’

এই জয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় ভ্রমণের ঝক্কি এড়িয়ে শেষ ৩২-এ সুইডেনের মুখোমুখি হবে ফ্রান্স, আর রানার্স-আপ নরওয়ে লড়বে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে।