শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ওয়াশিংটনে ঐতিহাসিক চুক্তির ঠিক ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই দক্ষিণ লেবাননে আবারও বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। এদিকে এই চুক্তিকে ‘অবমাননাকর’ ও ‘সার্বভৌমত্ব বিসর্জন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, দেশটির নাবতিয়াহ আল-ফাওকা শহরে ইসরায়েলি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। পরে ওই একই এলাকায় আরও বেশ কয়েকবার হামলার খবর পাওয়া গেছে, এতে অন্তত দুইজন আহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তাদের বাহিনীর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ানো এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করেই এই ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ৪ দফা শান্তি কাঠামোর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, দক্ষিণ লিতানি এলাকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সরে যাবে এবং সেখানে লেবাননের সেনাবাহিনী একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। তবে চুক্তি অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননের একটি বিস্তৃত নিরাপত্তা বলয়ে ইসরায়েলি বাহিনীকে অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে ঐতিহাসিক এবং ইরান ও হিজবুল্লাহর জন্য বড় ধাক্কা বলে উল্লেখ করেছেন।
তবে এই শান্তি প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই বাইরে রাখা হয়েছে হিজবুল্লাহকে। শনিবার হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম এক কড়া প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘ওয়াশিংটনের এই কাঠামো চুক্তি অবমাননাকর, লজ্জাজনক এবং সার্বভৌমত্বে আত্মসমর্পণের শামিল। এই চুক্তি আমাদের কাছে বাতিল ও অকার্যকর।’ তিনি অভিযোগ করেন, হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের শর্ত জুড়ে দিয়ে লেবানন সরকার সব ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করেছে। এই চুক্তি ওই এলাকাগুলোতে ইসরায়েলি দখলের পথ প্রশস্ত করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। এর জবাবে হিজবুল্লাহ সশস্ত্র প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, লেবানন সীমান্তের ভেতরে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করার প্রস্তুতি নিতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২ মার্চ ইরানি সর্বোচ্চ নেতা নিহতের প্রতিশোধ নিতে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালালে লেবানন সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল লেবাননজুড়ে বিমান হামলা এবং স্থল অভিযান শুরু করে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চলমান এই সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ১৯২ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১১ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ। এছাড়া বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১২ লাখের বেশি মানুষ। অন্যদিকে, ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী, সীমান্তে তাদের ৩৬ জন সেনা ও চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
এর আগে গত ১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ হয়েছিল। সর্বশেষ জুন মাসে দুই দেশ ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নবায়ন করতে সম্মত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী যেন অ-রাষ্ট্রীয় কোনো গোষ্ঠীর উপস্থিতি ছাড়াই ওই এলাকায় একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তার জন্য তারা সহায়তা করবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই শান্তি প্রচেষ্টা আবারও বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে।
সূত্র: বিবিসি