কূটনৈতিক বিচক্ষণতা প্রয়োজন

বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতিতে বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে দেশ কি ধীরে ধীরে চীনের নেতৃত্বাধীন নতুন বৈশি^ক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফর, চীনের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক এবং একই সময়ে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের নতুন মাত্রা নিয়ে আলোচনা এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গত কয়েক বছরে গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ এবং গ্লোবাল গভর্নেন্স ইনিশিয়েটিভ নামে চারটি বৈশি^ক উদ্যোগ সামনে এনেছেন। এসব উদ্যোগকে অনেক বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ^ব্যবস্থার বিকল্প কাঠামো হিসেবে দেখছেন। আবার কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, ‘এসব উদ্যোগ এক বিশ^ মেরুর বিপরীতে বহুমেরু বিশে^র পথ উন্মোচন করবে।’

উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সভ্যতা ও শাসনব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে চীন একটি নতুন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চাইছে। এ পথে ভারত, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো একসঙ্গে চলতে পারলে তা সবারই জন্য মঙ্গলজনক হবে। বাংলাদেশের জন্য এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই উদ্যোগে যুক্ত হলে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক লাভ কী হবে? বাংলাদেশে ভারসাম্যমূলক অর্থনৈতিক সহযোগিতার যে ধারা বিদ্যমান তা কী ঝুঁকিতে পড়বে? বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণে এর কোনো কার্যকর ভূমিকা থাকবে কিনা।

এই প্রেক্ষাপটে তিস্তা মহাপরিকল্পনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। তিস্তা অববাহিকার ২ কোটি মানুষের মাঝে এ নিয়ে আশা ও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচিত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় তিস্তাপাড়ের কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট, বর্ষায় বন্যা, নদীভাঙন, কৃষি উৎপাদনের অনিশ্চয়তা এবং দারিদ্র্যের চক্র উত্তরাঞ্চলের মানুষের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বাস্তব ও ফলপ্রসূ ক্ষেত্র হতে পারে তিস্তা মহাপরিকল্পনা। কারণ চীন বিশে^র অন্যতম দক্ষ নদী ব্যবস্থাপনা ও জলসম্পদ উন্নয়নকারী দেশ। ইয়াংসি, হলুদ নদী এবং পার্ল নদী অববাহিকায় তারা যে প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা তিস্তার মতো নদী ব্যবস্থাপনায় কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।

একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বিদেশি ঋণ বা অনুদানের অপেক্ষায় বসে থাকা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক নাও হতে পারে। পদ্মা সেতুর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে নিজস্ব অর্থায়নেও বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব। বর্তমান বাস্তবতায় সরকার চাইলে তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে ধাপে ধাপে নিজস্ব অর্থায়নে শুরু করতে পারে। প্রথম পর্যায়ে নদী ড্রেজিং, নদীশাসন, তীর সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ শক্তিশালীকরণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে। এসব কাজের জন্য পুরো প্রকল্পের অর্থ একসঙ্গে প্রয়োজন হবে না। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় কয়েক বছরের পরিকল্পনায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এর জন্য প্রথম কাজটি হবে একনেক অনুমোদন ও সময়বদ্ধ রোডম্যাপ ঘোষণা।

একই সঙ্গে চীনের কাছ থেকে সরাসরি ঋণ নয়, বরং কারিগরি সহযোগিতা, প্রকৌশল নকশা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বিশেষজ্ঞ সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের আর্থিক দায় কমবে, কিন্তু প্রযুক্তিগত সুবিধা পাওয়া যাবে। প্রকল্পের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণও পুরোপুরি বাংলাদেশের হাতে থাকবে। উত্তরাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন করে আসছে পদ্মা সেতু হয়েছে, পদ্মা ব্যারাজের একনেক অনুমোদন ও সময়বদ্ধ রোডম্যাপ ঘোষণা হলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেন হবে না? দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে যেভাবে বড় বিনিয়োগ করা হয়েছে, একইভাবে উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নেও রাষ্ট্রকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়নের ভারসাম্য রক্ষা না হলে আঞ্চলিক বৈষম্য আরও বাড়বে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি নদী উন্নয়ন প্রকল্প নয়। এটি কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক করিডর গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

এখানেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিচক্ষণতার প্রয়োজন রয়েছে। চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মানেই কোনো একটি ভূরাজনৈতিক বলয়ে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হয়ে যাওয়া নয়। বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতিতে বিশ্বাস করে। সেই নীতির আলোকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত এবং অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেই জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে যৌক্তিক পথ হতে পারে, চীনের বৈশ্বিক উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক বা আদর্শিক বিতর্কে না জড়িয়ে বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের দিকে মনোযোগ দেওয়া। যদি চীনের সহযোগিতায় তিস্তা মহাপরিকল্পনার কারিগরি প্রস্তুতি দ্রুত সম্পন্ন করা যায় এবং সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এর বাস্তবায়ন শুরু করে, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।

তিস্তাপাড়ের মানুষের প্রধান চাওয়া নদীভাঙন থেকে মুক্তি, সেচের পানি, নিরাপদ জীবন এবং উন্নয়নের সমান সুযোগ। বেইজিংয়ের বৈঠকগুলোর প্রকৃত সাফল্য তখনই মূল্যায়িত হবে, যখন তিস্তার দুই তীরে বসবাসকারী মানুষ বাস্তব পরিবর্তনের সুফল পাবে। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে প্রশ্ন; কীভাবে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত উন্নয়ন স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়। সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে উত্তরাঞ্চলের ভবিষ্যৎ এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত।

লেখক : সভাপতি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ

nazrul.hakkani@gmail.com