উন্নয়নের দুধ-মধু খেয়ে ফেলছে দুর্নীতি

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? কেউ বলবেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা। এর ফলে প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানিসহ জনজীবনে। কেউ বলবেন, সম্পদ কম কিন্তু মানুষ বেশি কীভাবে সম্ভব দেশকে পরিচালনা করা? বিশেষজ্ঞরা বলবেন, জলবায়ু বিপর্যয়ের প্রভাব সবখানে। আর কেউ বলবেন, মানুষ কাজ করে না। শেষে কেউ বলবেন, কিছু ব্যবসায়ীর লুটপাট, মাদক, মাস্তানি আর সাম্প্রদায়িকতার দুষ্ট চক্র। যদিও এর কোনোটাই ছোট সমস্যা নয় এবং এদের প্রভাবে মানুষের ত্রাহি অবস্থা। কিন্তু সব সমস্যা যেন কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে একটি সংকটে সেটি হচ্ছে সর্বত্র দুর্নীতি। এমনকি তা সর্ষের মধ্যে ভূতের মতো, দুর্নীতি দমন কমিশনের মধ্যেও। মাঝে মাঝে দু-একটা খবর বেরিয়ে আসে, যা মানুষকে আশ্বস্ত তো নয়ই বরং আতঙ্কিত করে। মানুষ ভাবে, তাহলে যাব কোথায়?

একটা সময় ঘুষ খাওয়া চলত গোপনে। তা প্রকাশ পেলে আশপাশের মানুষ বলত উনি ঘুষ খান। তারপর ধীরে ধীরে ঘুষ খাওয়াটা বাড়তি ইনকাম হয়ে দাঁড়াল। কোন চাকরি কতটা ভালো, তার বিচার হতো উপরি ইনকাম আছে কিনা, তা দিয়ে। এটা এতদূর বিস্তৃত হয়েছে যে, মেধার যাচাই করে যে চাকরি দেওয়ার পদ্ধতি, যাকে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা বা বিসিএস পরীক্ষা বলি ওই পরীক্ষায় পছন্দের তালিকায় সেই ক্যাডারগুলো লোভনীয় যেখানে ক্ষমতা এবং দুর্নীতির সুযোগ বেশি। ক্ষমতার কি মূল্য আছে, যদি দুর্নীতি করে টাকা রোজগার করা না যায়? ফলে মেধা, ক্ষমতা এবং দুর্নীতির মেলবন্ধন এখন লুকানো বিষয় নয়। সেবা খাত বলে যা প্রচারিত, তা ঘুষের আখড়া। একজন প্রথিতযশা অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন ঘুষ বলবেন না, বলুন স্পিড মানি। যা কাজের স্পিড বাড়িয়ে দেয়। অর্থনীতির দুর্নীতির কথা এখন তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখন বিবেচনা করতে হবে, দুর্নীতি অর্থনীতির কথা।

২০২৪-এর অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী সেøাগান ছিল প্রকাশ্যে। কিন্তু তার অন্তরালে ছিল দুর্নীতির হাত থেকে দেশ বাঁচানোর আকুতি। দেশের কোটি কোটি মানুষ ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদন করে, বিদেশে পরিশ্রম করে দেশে ডলার পাঠায় আর একদল মানুষ দেশের মানুষকে শোষণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে, বিদেশে টাকা পাচার করে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তারা বেতন নিয়ে ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে।  এসব দেখে ভুক্তভোগীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কিন্তু হয়রানি থেকে বাঁচার জন্য ঘুষ দেয়। একদল অন্যায় সুবিধা নেওয়ার জন্য যেমন ঘুষ দেয়, অন্যদিকে বেশিরভাগ মানুষ তার কাজটা যেন হয় এই আশায় ঘুষ দিতে বাধ্য হয়। এর বিপরীতে একটা ন্যায়ভিত্তিক সমাজের আশায় দেয়ালে সেøাগান লেখা হয়েছিল, ঘুষ চাইলে ঘুসি দেবেন। কিন্তু ওই যে ক্ষমতা আর দুর্নীতি হাত ধরাধরি করে চলে? তাই অভ্যুত্থানের পর যারা ক্ষমতায় এলেন, তাদের কয়েকজন সেই পুরনো পথে হেঁটেছেন। টিআইবির সাম্প্রতিক রিপোর্ট, এরই সত্যতা উন্মোচন করেছে। 

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের অনেক আশা ছিল। তারা একটা নতুন পথে প্রশাসন, বিচার, পুলিশ, শিক্ষা, চিকিৎসা ব্যবস্থাকে পরিচালনা করবেন। যেহেতু তারা কোনো বিপ্লব করেননি, তাই কোনো বৈপ্লবিক পদক্ষেপ আশা করেননি কেউ। পুরনো পথেই দেশকে চালানো হয়েছে, শুধু ক্ষমতাসীনদের চেহারা বদলে গেছে। এই বিতর্ক চলছে এখনো এবং চলবে বহুদিন। কিন্তু জনগণ তো পরিবর্তন চেয়েছিল, রাস্তায় নেমেছিল, জীবন দিয়েছে এই সত্যকে মুছে ফেলা যাবে না। যেহেতু ব্যবস্থা বদল করার ইচ্ছা ক্ষমতাসীনদের ছিল না, তাই তারা ব্যবস্থার সুবিধা নিতে চেয়েছে এবং পুরনো শাসকদের প্রতি জনগণের ক্ষোভ কাজে লাগিয়েছে। ১৮ মাসের খতিয়ান দেখলে, এই লজ্জাকর চিত্র ফুটে ওঠে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশসহ বিশে^র দেশে দেশে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরছে। কোনো ক্ষমতাসীন সরকারই তাদের রিপোর্ট গ্রহণ করে না, ক্ষোভ প্রকাশ এবং অসৎ উদ্দেশ্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। কিন্তু জনগণ মনে করে, রিপোর্ট ঠিক আছে। বরং দুর্নীতি আরও বেশি, যার পুরো চিত্র উঠে আসেনি। ইতিমধ্যে প্রকাশিত এক রিপোর্টে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত, এক বছরে বিভিন্ন সেবা খাতে মোট ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ‘সেবা খাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক এক জরিপের ফলাফলে এ তথ্য তুলে ধরে তারা দেখিয়েছে দুর্নীতি দূর হয়নি, কমেনি বরং ধারাবাহিকতা থেকেছে। তাদের জরিপে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নমুনাকাঠামো ব্যবহার করে দেশের আটটি বিভাগের গ্রাম ও শহরাঞ্চল থেকে দুই ধাপে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ১ হাজার ১৪৯টি এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট ১৮টি সেবা খাতের চিত্র তুলে ধরেছে তারা। এবারই প্রথম নয়, এর আগেও ২০২৩ সালে জরিপ করেছিল টিআইবি।

জরিপের ফলাফল থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০২৩ সালের মতো ২০২৫ সালেও পাসপোর্ট (৭৬.৬ শতাংশ) ও বিআরটিএ (৬৩.৫) থেকে সেবা নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ঘুষ দিতে হয়েছে। ঘুষ দুর্নীতির তালিকায় এরপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, কৃষি, ভূমি ও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা খাত। এসব খাতে গড় ঘুষের পরিমাণও সবচেয়ে বেশি। টিআইবির জরিপে অংশ নেওয়া ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার মনে করে, ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও বিচারিক সেবায়, ঘুষ ও দুর্নীতির উচ্চহার মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বাধা। পাশাপাশি কৃষি, স্থানীয় সরকার, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাসপোর্ট ও বিআরটিএ খাতে দুর্নীতির প্রবণতা বেড়েছে বা আগের মতো রয়ে গেছে।

একটা বিষয় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষ দুর্নীতিকে মেনে না নিলেও, প্রতিবাদ করার মানসিকতা পোষণ করে না। কারণ সে মনে করে, এতে তো তার কাজ হবেই না বরং বিপদে পড়বে। তাই দুর্নীতির শিকার হলেও, ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার কোনো অভিযোগ করেনি। তাদের মতে, পুরো ব্যবস্থাই দুর্নীতিগ্রস্ত। আবার প্রায় অর্ধেক পরিবারের দুর্নীতির অভিযোগ কোথায় ও কীভাবে করতে হয়, সে বিষয়ে কোনো ধারণা নেই। যেমন দুদক সম্পর্কে ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) সম্পর্কে মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার জানলেও, অভিযোগ করার হার খুব কম। আবার অভিযোগ করা হলেও, অনেক ক্ষেত্রে তা গ্রহণ করা হয় না বা ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। দুর্নীতি হয় কেন, দুর্নীতি কমে না কেন এবং দুর্নীতি বাড়ে কেন? এসব প্রশ্নের সাধারণ উত্তর হিসেবে জরিপে অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, দুর্নীতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বিচারহীনতা, সচেতনতার অভাব এবং দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির বদলে সুবিধা পাওয়া। দুর্নীতিবাজরা দাপটের সঙ্গে থাকে এবং প্রমোশন পায়, খুব বেশি বিপদ দেখলে বিদেশে পাড়ি জমায়।

জরিপে দেখানো হয়েছে, গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলো শহরের তুলনায় বেশি ঘুষের শিকার হয় (৬৬ শতাংশ বনাম ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ)। যদিও ঘুষের পরিমাণের দিক থেকে শহরের পরিবারগুলোকে বেশি টাকা দিতে হয়েছে। আর আয়ের দিক থেকে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের তুলনায় বেশি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়। আরেকটি বিষয় উদ্বেগজনক। দুর্নীতি নারী, আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা প্রতিনিয়ত বলা হলেও, প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল সেবা চালু হলেও, সেটি দুর্নীতি কমাতে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের এখনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, ফলে ঘুষ ও দুর্নীতির সুযোগ রয়েই যাচ্ছে।

টিআইবির রিপোর্ট নিয়ে প্রতিবাদ হবে, এটাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করবেন কেউ কেউ। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠান তো অভ্যুত্থানের পক্ষে মতামত দিয়েছিল। বিগত সরকারের দুর্নীতির কথাও তাদের রিপোর্টে প্রকাশ করেছিল। ফলে বিষোদগার করার আগে, রিপোর্ট খতিয়ে দেখাই জরুরি। দেখা দরকার, কেন দুর্নীতি বন্ধ হয় না। দুর্নীতির শিকড় অক্ষুন্ন রেখে, শুধু ডাল পালা ছেঁটে দিলে দুর্নীতি বন্ধ হয় না। বরং নতুন ডালপালা, পাতা গজায়। পুরনো গাছ সবুজ হয়ে উঠে নতুন পাতায়। দেশে শুধু দুর্নীতি নয়, টাকা পাচার কি বন্ধ হয়েছে? আর একটা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ৪১ শতাংশ বেড়েছে। বিদেশে বিনিয়োগের জন্য ঘুরছেন, আহ্বান জানাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, আইএমএফের কাছে কঠিন শর্তে ঋণ নেওয়া হচ্ছে যার ফলে দাম বাড়ছে বিদ্যুতের, খরচ বাড়ছে উৎপাদনের আর ঝুঁকি বাড়ছে রপ্তানির। কিন্তু অর্থ পাচার বন্ধ না হলে, ঋণের টাকায় দেশের উন্নতি হবে? উন্নয়ন হবে কিছু অবকাঠামোর, সম্পদ বাড়বে মুষ্টিমেয় মানুষের। তবে দুর্নীতি খেয়ে ফেলবে উন্নয়নের দুধ মধু। বৈষম্য বাড়বে বাধাহীনভাবে। কথাটা শুনতে হয়তো খারাপ লাগলেও বলতে হয়, পুঁজিবাদী শোষণ ও লুণ্ঠন হচ্ছে দুর্নীতির উর্বর জমি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভকে যেন, সার্বিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালনা করা হয়, সেটাই কাম্য।

লেখক : রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

rratan.spb@gmail.com