তুরাগ নদ থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুই কর্মীর লাশ উদ্ধার নিয়ে সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারছে না পুলিশ। বিষয়টি নিয়ে গতকাল রবিবার পৃথক সংবাদ সম্মেলন করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও ঢাকা জেলা পুলিশ।
‘সাত লাশ নিয়ে ছড়ানো তথ্য গুজব, অপপ্রচারে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে’, সংবাদ সম্মেলনে এমন হুঁশিয়ারি দিলেও উদ্ধারকৃত দুই লাশের (সুমন ও আরিফের) বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানানো হয়নি। সুমন ও আরিফ কীভাবে নদীতে পড়ে গেল, সেদিন কী ঘটেছিল, তদন্তে এখন পর্যন্ত কী পাওয়া গেল এসবের কোনো ব্যাখ্যাই দেয়নি পুলিশের কোনো ইউনিট। ফলে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা নিয়ে জনমনে সেই বিভ্রান্তি ও প্রশ্ন রয়েই গেছে। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীরের দাবি, সুমন ও আরিফ দুর্ঘটনাজনিত ও সাঁতার না জানার কারণে পানিতে ডুবে মারা গেছেন। অন্যদিকে শোকাহত দুই পরিবার গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছে। এ বিষয়ে তারা কথা বলতে রাজি নন।
নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা জেলার এসপি শামীমা পারভীন জানান, গত ২৬ জুন রাতে আশুলিয়া থানা পুলিশ গরুহাটা ঘাটসংলগ্ন আশুলিয়া নদী থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ে একজনের মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহের সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে নিহতের ভাই মো. সালাহউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মরদেহটি তার ভাই মো. সুমন (১৭) হিসেবে শনাক্ত করেন। সুমন ২২ জুন দুপুরে ২০-২২ জন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে তুরাগে নৌভ্রমণে বের হন। বিকেলে নৌকা থেকে নামার সময় অসাবধানতাবশত নদীতে পড়ে যান। সাঁতার না জানায় তিনি স্রোতের সঙ্গে তলিয়ে যান। পরে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তার মরদেহ ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
আর ২৪ জুন সাভারের রয়েল সিটি খেয়াঘাট এলাকায় তুরাগ নদীতে গোসল করতে নেমে রনি (৩৫) নামে এক ব্যক্তি নিখোঁজ হন। স্থানীয়রা ৩০ মিনিট পরে তার মরদেহ উদ্ধার করেন। পরে শাহআলী ও আমিনবাজার নৌ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। দুটি ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। তার দাবি, দুটি ঘটনাই দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু। এর সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আর সাতজনের মরদেহ উদ্ধারে যে গুজব ছড়ানো হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ফারুক হোসেন জানান, সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তুরাগ নদ থেকে একাধিক মরদেহ উদ্ধার হওয়া সংক্রান্ত কিছু তথ্য, ছবি ও ভিডিও ছড়াতে দেখা যায়। ডিএমপি গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে এবং তুরাগ থানা এলাকায় এ ধরনের কোনো ধারাবাহিক মৃতদেহ উদ্ধার, হত্যাকা- কিংবা এ সংক্রান্ত অন্য কোনো ঘটনার সংবাদ পায়নি। এ বিষয়ে তুরাগ থানায় কেউ কোনো অভিযোগ, জিডি বা মামলা দায়ের করেনি। ছড়িয়ে পড়া তথ্য, ছবি ও ভিডিও ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর।
এর আগে গত শনিবার বিষয়টি গুজব বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ সদর দপ্তর। তবে দুই লাশ নিয়ে সঠিক কোনো ব্যাখ্যা কোনো ইউনিট দেয়নি।
নিহত আরিফুল ইসলাম রাকিবের প্রসঙ্গ নেই : ঢাকা জেলার এসপি শামীমা পারভীন সংবাদ সম্মেলনে সুমন ও রনি মোল্লার লাশ উদ্ধারের কথা উল্লেখ করলেও আরিফুল ইসলাম রাকিবের বিষয়ই তুলেননি। আমিনবাজার নৌ থানা পুলিশ ২৪ তারিখ দুপুরে রনির মরদেহ উদ্ধার করে, একই দিন সকালে গাবতলী লামারঘাট সংলগ্ন নদী থেকে আরিফুল ইসলাম রাকিবের মরদেহও উদ্ধার করে। আরিফুল ইসলাম রাকিবের মৃত্যুর সঙ্গে তুরাগ নদের ঘটনার সম্পৃক্ততা ব্যাপক আলোচিত হলেও এই লাশ উদ্ধার নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে কোনো তথ্যই দেননি এসপি।
আরিফ রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা। সেদিন লাশ উদ্ধারের খবর শুনে তার বাবা আব্দুল হাই, চাচা আসাদুলসহ অন্যরা এসে আরিফের মরদেহ শনাক্ত করেন এবং ময়নাতদন্তের পর মরদেহ নিয়ে যান।
আমিনবাজার নৌ থানার ওসি হুমায়ুন কবির বলেন, যেখান থেকে রনি মোল্লার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এর কাছাকাছি জায়গায় তারা কয়েকজন গোসলে নেমেছিলেন। সাঁতার না জানায় তিনি পানিতে ডুবে মারা গেছেন। আর একই দিন সকালে উদ্ধার করা আরিফুল ইসলাম রাকিবের মরদেহ ২-৩ দিন আগের হবে। লাশ পচে ফুলে গেছে।
ঘটনা দুটি তদন্তে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের কোনো অগ্রগতির তথ্য নেই। সুমনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম বলেন, অপমৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলা তদন্তে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসল বিষয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে হত্যা এলে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত করা হবে। তাই ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এদিকে নিহত সুমন ও আরিফের পরিবারের সবাই গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছেন। গতকাল ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের রানাভোলা এলাকায় গিয়ে তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। মোবাইলে যোাগাযোগ করা হলে সুমনের বাবা মো. শাহ আলম বলেন, তারা গ্রামের বাড়ি গাজীপুরে রয়েছেন। ছেলে হারানো শোকে পরিবারের সবাই শোকাহত।
একই এলাকায় বোনের বাসায় থাকতেন নিহত আরিফুল। তার পরিবারও গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছে বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রতিবেশী জানান, আরিফ পড়ালেখা করত। আগে ওই এলাকায় থাকলেও সম্প্রতি গাজীপুরে থাকত। তবে মাঝেমধ্যে এখানে বোনের বাসায় বেড়াতে আসত। আরিফের লাশ এলাকায় নেওয়ার পর তিনি দেখেছেন দাবি করে বলেন, সাধারণত পানিতে ডুবে মারা গেলে লাশের যে অবস্থা হয়, ওর লাশটি দেখে তেমনটা মনে হয়নি। লাশটি দেখে অনেকের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে, কোনো কিছু দিয়ে আঘাত করে ওকে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
এমপির ব্যাখ্যা : সামাজিক মাধ্যমে এই হত্যাকা-ের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীরের দিকে আঙুল তোলা হয়। তবে এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেছেন, নদীতে যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই অসাবধানতাবশত পানিতে ডুবে মারা গেছেন এবং তাদের পরিবারও তা স্বীকার করেছে। উদ্ধার হওয়া ৩টি মৃত্যুই দুর্ঘটনাজনিত এবং সাঁতার না জানার কারণে ঘটেছে। আর ৭ নেতাকর্মী হত্যার যে গল্প ফেসবুকে ছড়ানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ কাল্পনিক, বানোয়াট এবং একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।
ঘটনার সঠিক তথ্য পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে না জানালেও বিষয়টি নিয়ে প্রথম দিকে তদন্তে নামে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম। ওই টিম তদন্ত করে জানতে পারে, ২২ তারিখে তুরাগ থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফিকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ২৫-৩০ জন নেতাকর্মী নৌকাযোগে আশুলিয়ার রুস্তমপুর ঘাট থেকে আশুলিয়া বাজার ঘাটে মিছিল করার উদ্দেশ্যে আসেন। এতে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা ও পুলিশ তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ধাওয়া করলে নেতাকর্মীরা আতঙ্কে নদীতে ঝাঁপ দেন। এতে সুমন ও আরিফ পানিতে তলিয়ে যান। পরে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।