ভেনেজুয়েলায় ধ্বংসস্তূপে প্রাণের আশা কমছে

শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে ল-ভণ্ড হয়ে পড়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। ধ্বংসাত্মক এই দুর্যোগে দেশটিতে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো হাজার হাজার মানুষ আটকা পড়ে থাকায় সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভূমিকম্প আঘাত হানার পর গোল্ডেন সময় হিসেবে পরিচিত ৭২ ঘণ্টা শেষ হয়েছে। কিন্তু এখনো উদ্ধার কার্যক্রম ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ফলে সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসস্তূপে প্রাণের আশা কমছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ বলেন, ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৪৩০ জনে পৌঁছেছে। হাজারো মানুষ আহত হয়েছেন। অনেক পরিবারকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। লা গুয়াইরাসহ দুর্গত এলাকাগুলোতে ত্রাণ বিতরণ চলছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বন্দর শহর লা গুয়াইরা ও রাজধানী কারাকাসের কিছু অংশে উদ্ধারকারীরা ছড়িয়ে পড়ার পর শনিবার মৃতের সর্বশেষ সংখ্যা সামনে আসে। পরিবারগুলো ও স্বেচ্ছাসেবীরা এই এলাকাগুলোয় চার দিন ধরে জীবিতদের ও মৃতদেহ উদ্ধার করে চলছেন। তবে ভারী সরঞ্জামের অপ্রতুলতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের সীমিত উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স। যদিও কর্র্তৃপক্ষ জোরালোভাবে সরকারি তৎপরতার চিত্র তুলে ধরছে। উদ্ধারকাজে যানজট বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষ লা গুয়াইরায় প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে এবং কারাকাস থেকে আসা প্রধান সড়কটি ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। সরকারি উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যুক্ত নন এমন বেসামরিক নাগরিকদের চেকপয়েন্ট পার হতে পরিচয়পত্রের প্রয়োজন হচ্ছে।

দেশটির সরকার জানিয়েছে, এ পর্যন্ত কয়েকশ মানুষ নিখোঁজ বা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন। কিন্তু দেশটির বিরোধীদলীয় ওয়েবসাইটে ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। আর জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভের (ইউএসজিএস) হিসাবে শক্তিশালী ওই দুই ভূমিকম্পে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বলেছে, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ৬০ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ। যার মধ্যে শুধু কারাকাসেই রয়েছে ২০ লাখ বাসিন্দা। ইতিমধ্যে ১ হাজার ৬০০ এর বেশি বিদেশি উদ্ধারকর্মী ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছেন। আরও কয়েকটি দল দেশটিতে যাওয়ার পথে রয়েছে।

জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ বলেন, প্রতিটি মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা অলৌকিক ঘটনা। তিনি আরও বলেন, এই ট্র্যাজেডির ভয়াবহতা সম্পর্কে আমরা কিছুই গোপন করব না। লা গুয়াইরায় বেঁচে যাওয়া মানুষের মধ্যে খাদ্য ও পানি বিতরণ করেছে সরকারি বাহিনী। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, জীবিতদের উদ্ধারের এই সংকটপূর্ণ সময়ে তার সরকার সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোকে স্বাগত জানিয়েছেন। ভূমিকম্পের পর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে পুরো অঞ্চল বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছিল। তবে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে।

এদিকে, ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা ৩২ ঘণ্টা আটকে থাকার পর ১৮ দিন বয়সী এক নবজাতককে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তাকে উদ্ধারের সময় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহর লা গুয়াইরায় উপস্থিত মানুষ উল্লাসধ্বনি ও করতালিতে ফেটে পড়েন। পরে শিশুটির মাকেও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ক্ষমতাচ্যুত নিকোলাস মাদুরোর স্থলাভিষিক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, এই ঘটনাগুলো ‘এই দুর্যোগের মধ্যেও আমাদের আনন্দ দেয়’। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, লা গুয়াইরায় একটি আবাসিক ভবন ধসে পড়ার পর ২৪ ঘণ্টা আটকে থাকা চার বছর বয়সী এক শিশুপুত্রকে উদ্ধার করা হচ্ছে। এরপর উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে তার মা ও বাবাকেও জীবিত বের করে আনেন। ভূমিকম্পের তিন দিন পর গত শনিবার ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৯ মাসের এক শিশুসহ ৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছেন কর্মীরা।

গত বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যার আগে প্রথমে ৭ দশমিক ২ মাত্রার ও এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় আরেকটি ভূমিকম্প হয়। উত্তরাঞ্চলে উৎপত্তি হওয়া এই ভূমিকম্পে উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূল ভূমিকম্প দুটির পর থেকে দুই শতাধিকের বেশি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে।