২৭ জেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপের আশঙ্কা

গত বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছিল বরগুনায়, এবার সে রকম হতে পারে বাগেরহাটেও। গত  বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই জেলায় ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২১৮ জন, যেখানে গতবার এই দিন পর্যন্ত ভর্তি হয়েছিল মাত্র পাঁচজন। সে তুলনায় প্রায় ৪৩ দশমিক ৬ গুণ রোগী বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু এই একটি জেলায়ই নয়; এবার নতুন করে আরও কিছু জেলায় ডেঙ্গু বাড়ছে। এ ছাড়া গত বছর যে ৩২ জেলায় ৫০০ থেকে ১০ হাজারের কাছে রোগী ছিল, তার মধ্যে ১১ জেলায় গতবারের তুলনায় এবার এখন পর্যন্ত রোগী বেশি। তবে ৩২ জেলার মধ্যে ৯ জেলায় ভর্তি রোগী কমলেও তা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। তাতে সব মিলিয়ে এবার অন্তত ২৭ জেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছর দেশের ৩২ জেলায় ডেঙ্গু রোগী বেশি ছিল। এর মধ্যে আট জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল ভয়াবহ; রোগী ছিল ২ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে। এবার নতুন করে সাত জেলায় তুলনামূলকভাবে বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছে; সবচেয়ে বেশি ভর্তি হচ্ছে বাগেরহাটে। গত বছর বরগুনায় বেশি হলেও এবার বাগেরহাটে রোগী বেশি হতে পারে বলে বলছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বাগেরহাটে ২০২৫ সালে ভর্তি হয়েছিল ৩৮১ জন। এবার মৌসুমের শুরুতেই ২১৮ জন রোগী ভর্তি হওয়ায় অনেকে মনে করছেন, এ বছর ডেঙ্গু বাগেরহাটবাসীকে বেশ ভোগাবে। স্থানীয়রাও এবার ডেঙ্গু নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছে। বাগেরহাট জেলা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. তাপস কুমার সরকার বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীর খুব চাপ আছে। প্রতিদিনই অনেক রোগী ভর্তি হচ্ছে।’ 

বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. আ. স. মো. মাহবুবুল আলম জানান, জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে কচুয়া ও মোরেলগঞ্জে ডেঙ্গু রোগী বেশি। অন্য উপজেলাগুলোয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। এ দুই উপজেলায় বেশি রোগীর জন্য তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) দায়ী করেছেন। পাউবোর প্রজেক্টের কারণে খালের মুখ বন্ধ করে দেওয়ায় মোরেলগঞ্জ ও কচুয়ায় ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে। ওখানে ঘরে ঘরে এ জ¦র ছড়িয়েছে। এ নিয়ে পাউবো যদি কিছু না করে, তাহলে আমাদের তো কিছু করার নেই। আমরা তো রোগী ভর্তি রাখছি, চিকিৎসা দিচ্ছি।’

গত বছর ২৫ জুন পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে সারা দেশের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ৮ হাজার ৮৭০ জন, মৃত্যু হয়েছে ৩৬ জনের। এবার একই সময়ে ভর্তি হয়েছে ৫ হাজার ৫১৫ জন, মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের। যদিও গতবারের তুলনায় এবার ৩৮ শতাংশ রোগী কম, মৃত্যুও কম।

গত বছর যে ৩২ জেলায় ৫০০ থেকে ১০ হাজার মধ্যে রোগী ছিল সেগুলো হলো বরগুনা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, পটুয়াখালী, বরিশাল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, পিরোজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কক্সবাজার, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, যশোর, মাদারীপুর, খুলনা, সিরাজগঞ্জ, ফেনী, ঢাকা, ভোলা, ঝালকাঠি, বান্দরবান, জামালপুর, বগুড়া, কুষ্টিয়া, পাবনা, লক্ষ্মীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

গত বছর সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছিল বরগুনায় ৯ হাজার ৫৩৪ জন। এরপর গাজীপুরে ৪ হাজার ৭৫৪ জন, চট্টগ্রামে ৪ হাজার ৭২৯, পটুয়াখালীতে ৪ হাজার ৫৯৩, বরিশালে ৪ হাজার ৫৩, ময়মনসিংহে ৩ হাজার ৭, কুমিল্লায় ৩ হাজার এবং মানিকগঞ্জে ২ হাজার ৪১৩ জন। এই আট জেলার তিনটিই বরিশাল বিভাগে। গত বছরও বরিশাল বিভাগে রোগী বেশি ছিল। এবারও বরিশাল বিভাগে রোগী বেশি। গত বছর ২৫ জুন পর্যন্ত বরগুনায় ২ হাজার ৪০৭ ভর্তি হয়েছিল, এবার ভর্তি হয়েছে ১৪৯ জন; পটুয়াখালীতে ৫০১, এবার ২৫৯; বরিশালে ৮১৫, এবার ৩৬৫। গতবারের তুলনায় তিন জেলায় তুলনায় এবার রোগী কম ভর্তি হয়েছে।

১১ জেলায় এবার আরও বেশি রোগী : গত বছর ২৫ জুন পর্যন্ত ময়মনসিংহে ৭২ জন ভর্তি হয়েছিল, এবার ভর্তি হয়েছে ১০৪ জন; পিরোজপুরে ১৫৯, এবার ৩৬৫; নরসিংদীতে ৭৬, এবার ৯৪; যশোরে ৩৩, এবার ৫০; খুলনায় ৭৭, এবার ১৭০; সিরাজগঞ্জে ১১, এবার ৩৬; ফেনীতে ৬, এবার ২৫; ঝালকাঠিতে ৪১, এবার ২৮২; বান্দরবানে ৩২, এবার ৮৫ জন; বগুড়ায় ১৩, এবার ৪৩ এবং কুষ্টিয়ায় ৯, এবার ২৩ জন।

সাত জেলায় বাড়ছে : বাগেরহাট ছাড়াও আরও ছয় জেলায় গতবারের চেয়ে গতকাল পর্যন্ত বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। হবিগঞ্জ গতবার ছিল আটজন, এবার ২৬; লালমনিরহাটে তিনজন, এবার ১১; শেরপুর আট, এবার ২২; মাগুরায় ২৫, এবার ৫৫; নওগাঁয় সাত, এবার ১২;  নাটোরে ৯, এবার ১৭ ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া গতবারের চেয়ে বরগুনা, চট্টগ্রাম, পুটয়াখালী; বরিশাল, চাঁদপুর গাজীপুর, কুমিল্লায়, কক্সবাজার; মাদারীপুরে ডেঙ্গু রোগী কমলেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।

পাঁচ জেলায় অবস্থা প্রায় একই : মানিকগঞ্জে গত বছর ২৫ জুন পর্যন্ত ভর্তি রোগী ছিল ৪৯, এবার  হয়েছে ৫৯ জন; কিশোরগঞ্জে ৬৩, এবার ৫৩; ভোলায় ৬২, এবার ৬৯; রাজশাহীতে ৬৬, এবার ৫৭; টাঙ্গাইলে ৪৪, এবার ৪৫। এ ছাড়া ১৬ জেলায় গতবারের চেয়ে এবার গতকাল পর্যন্ত রোগী কমেছে বরগুনায়, চট্টগ্রাম, পটুয়াখালী, বরিশাল, চাঁদপুর, গাজীপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, কক্সবাজার, মাদারীপুর, ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পাবনা, লক্ষ্মীপুর, জামালপুরে।

২০১৯-২৫ সালের চিত্র : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ডেঙ্গু নিয়ে ১ লাখ ১ হাজার ৩৭৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল, মৃত্যু হয়েছিল ১৬৪ জনের। ২০২০ সালে করোনার কারণে ডেঙ্গুর দিকে নজর ছিল না। ২০২১ সালে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ২৮ হাজার ৪২৯ জন, মৃত্যু হয়েছিল ১০৫ জনের। ২০২২ সালে ৬২ হাজার ৩৮২ জন ভর্তি হয়েছিল, মৃত্যু হয়েছিল ২৮১ জনের। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু পরিস্থিত আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ভর্তি হয় তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন, মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের। ২০২৪ সালে ভর্তি হয় ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন, মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। ২০২৫ সালে ভর্তি হয় ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন, মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ‘এবারও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে। কিছু জেলায় আমরা লার্ভার ঘনত্ব বেশি পেয়েছি। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আমরা একটি জরিপ চালিয়েছি, সেখানে কোথাও কোথাও ঘনত্ব অনেক বেশি।’