তীব্র তাপপ্রবাহে নাকাল ইউরোপবাসী

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গত এক সপ্তাহের মধ্য ইউরোপজুড়ে চলেছে স্মরণকালের সর্বোচ্চ তাপপ্রবাহ। তীব্র গরমে একদিকে যখন জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠছে, অন্যদিকে দেশে দেশে বাড়ছে প্রাণহানির সংখ্যা। পশ্চিম ইউরোপে যে তাপপ্রবাহে ইতিমধ্যে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে, সেটি এবার পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক জায়গায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। গত কয়েকদিন ধরে চলা তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ফ্রান্সে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য কর্র্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে আল্পস পর্বতমালা পর্যন্ত বহু দেশে তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে বলে জানিয়েছে এএফপি ও রয়টার্স। জার্মানি ও ইতালিতে তীব্র গরমে হাঁসফাঁস করছে মানুষ। ব্রিটেন, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানিতে চলতি মাসে যে গরম পড়েছে, তা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য সংস্থা পাবলিক হেলথ ফ্রান্স গতকাল রবিবার এক বিবৃতিতে জানায়, ২৪ জুন থেকে এ পর্যন্ত আগের মাসগুলোর একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক হাজার অতিরিক্ত মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ছিলেন। সংস্থাটি বলেছে, যেসব অঞ্চল সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘রেড অ্যালার্ট’-এর আওতায় ছিল, সেগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে প্যারিস ও তার আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে বাসায় মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, এসব তথ্য এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। গতকাল ফ্রান্সে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও, এর আগে কয়েকদিন ধরে দেশের অনেক এলাকায় পারদ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। জার্মান আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের ময়েকার্ন-ড্রেভিৎস এলাকায় গত শনিবার তাপমাত্রা ৪১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়।

ডেনমার্কে আরহুস শহরের উত্তরে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা ১৮৭৪ সালে পরিমাপ শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ। চেক প্রজাতন্ত্রেও প্রাগের উত্তরে ৪০.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। আর সেøাভাকিয়ার রাজধানী ব্রাতিসøাভায় শুক্রবার ছিল ইতিহাসের উষ্ণতম রাত। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এই তীব্র তাপপ্রবাহ প্রায় অসম্ভব ছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সপ্তাহে রাতের বেলা এত বেশি গরম পড়ার সম্ভাবনা ২০ বছর আগের তুলনায় এখন ১০০ গুণ বেশি। আবহাওয়াবিদ কার্স্টনে ব্রান্ট বলেন, সপ্তাহান্তে জার্মানির কিছু এলাকায় তাপপ্রবাহ সবচেয়ে বেশি হবে। আর তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির অনেক ওপরে উঠতে পারে। হাঙ্গেরিতে দানিয়ুব নদীর পানি উষ্ণ হয়ে ওঠায় পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি রিঅ্যাক্টরের উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে সুইজারল্যান্ডের বেজনাউ পারমাণবিক কেন্দ্রও আরে নদীর পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখে।

ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত শনিবার ও রবিবারের জন্য মিলান, রোম, তুরিন, ভেনিস, জেনোয়া, ফ্লোরেন্স ও বোলোনিয়াসহ ১৮টি শহরে সর্বোচ্চ মাত্রার (রেড অ্যালার্ট) তাপপ্রবাহ সতর্কতা জারি করেছে। ইতালির আল্পস অঞ্চলের বোলজানো শহরে শুক্রবার ছিল জুন মাসের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ রাত। শহরের আবহাওয়াবিদ ডিটার পিটারলিন জানান, রাতভর তাপমাত্রা ২৫.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেনি। পরিবেশবিদরা ইউরোপের হিমবাহগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

অত্যধিক তাপের কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সড়ক ও রেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জার্মান রেলওয়ে অপারেটর ডয়চে বান যাত্রীদের আগামী সপ্তাহের শুরু পর্যন্ত দূরপাল্লার যাত্রা বাতিলের সুযোগ দিয়েছে। অন্যদিকে নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়া রাজ্যে কিছু ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। অত্যধিক গরমে হামবুর্গের কাছে জার্মানির অন্যতম ব্যস্ত একটি মহাসড়কের একটি লেনে ফাটল দেখা যাওয়ায় আংশিক বন্ধ করে দেওয়া হয়। রয়টার্স ক্লাইমেট মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, ‘ওমেগা ব্লক’ নামের এক বিরল আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে ইউরোপজুড়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৩২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত বেড়ে গেছে। গ্রিক বর্ণ ‘ওমেগা’-এর মতোআকৃতির এই ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র গরম আটকে থাকে এবং এর প্রান্তে অপেক্ষাকৃত শীতল আবহাওয়া বিরাজ করে।