জাপানকে হালকাভাবে দেখার ভুল করলে চলবে না নেইমারদের

বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব শুরু মানেই অন্য এক ফুটবল। এখানে গ্রুপ পর্বের হিসাব-নিকাশ, অতীতের রেকর্ড কিংবা ফিফা র‌্যাংকিং অনেক সময় অর্থহীন হয়ে যায়। একটি ভুল, একটি মুহূর্তের অসাবধানতা অথবা একজন খেলোয়াড়ের অসাধারণ নৈপুণ্য, এসবই নির্ধারণ করে দেয় কে থাকবে আর কে বিদায় নেবে। তাই ব্রাজিল ও জাপানের শেষ ৩২-এর লড়াইকে আমি শুধু ফেবারিট বনাম আন্ডারডগের ম্যাচ হিসেবে দেখি না। এটি দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের সংঘর্ষ।

ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সুখবর, এই ম্যাচে নেইমার পুরোপুরি ফিট এবং খেলবে। দীর্ঘদিন ধরে এই দলের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সে। অনেকেই বলেন, ব্রাজিল এখন আর শুধু নেইমার-নির্ভর নয়। কথাটা ঠিক। কিন্তু বড় ম্যাচে একজন অভিজ্ঞ নেতার উপস্থিতি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা যারা মাঠে খেলেছে, তারা ভালো করেই জানে। কঠিন মুহূর্তে বল ধরে রাখা, ফাউল আদায় করা, সতীর্থদের ছন্দে ফিরিয়ে আনা কিংবা একটি নিখুঁত পাসে পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা নেইমারের আছে। নকআউট ম্যাচে এই গুণগুলোই সবচেয়ে মূল্যবান।

তবে ব্রাজিলের শক্তি কেবল একজন খেলোয়াড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের উইংয়ে গতি আছে, মাঝমাঠে সৃজনশীলতা আছে, রক্ষণেও রয়েছে অভিজ্ঞতা। বর্তমান ব্রাজিল দলটি আগের মতো শুধু সৌন্দর্যের ফুটবল খেলে না; তারা অনেক বেশি বাস্তববাদী। কখন দ্রুত আক্রমণে যেতে হবে, কখন বল ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করতে হবে, এই ভারসাম্যই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

অন্যদিকে জাপান এমন একটি দল, যাদের বিপক্ষে খেলতে কোনো বড় দলই স্বস্তি পায় না। কারণ তারা কখনো ম্যাচ থেকে মানসিকভাবে ছিটকে যায় না। ৯০ মিনিট ধরে একই শৃঙ্খলায় খেলতে পারে। তাদের খেলোয়াড়রা বল ছাড়া যেমন পরিশ্রম করে, বল পেলেও তেমনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলার অভিজ্ঞতা জাপানের অনেক ফুটবলারের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। তারা এখন বড় দলের জার্সি দেখে ভয় পায় না।

আমার মনে হয়, ম্যাচের প্রথম ২০ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। ব্রাজিল যদি শুরু থেকেই নিজেদের ছন্দে খেলতে পারে এবং উইং দিয়ে আক্রমণ বাড়াতে পারে, তাহলে জাপানের রক্ষণে চাপ তৈরি হবে। কিন্তু জাপান যদি শুরুতে ব্রাজিলকে আটকে রাখতে পারে, তাহলে ধীরে ধীরে ম্যাচের চাপ উল্টো ব্রাজিলের দিকেই চলে যাবে। কারণ নকআউট ম্যাচে সময় যত গড়ায়, ফেবারিট দলের ওপর মানসিক চাপও তত বাড়ে।

জাপানের সবচেয়ে বড় কৌশল হবে নেইমারকে স্বাধীনভাবে খেলতে না দেওয়া। তারা নিশ্চিতভাবেই মাঝমাঠে তাকে ঘিরে রাখবে এবং দ্রুত প্রেসিং করবে। নেইমার যদি মাঝমাঠ থেকে সহজে বল নিতে না পারেন, তাহলে ব্রাজিলকে দুই প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ গড়তে হবে। সেখানেই ভিনিসিয়ুস ও রাফিনিয়াদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আর ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কতা থাকবে জাপানের পাল্টা আক্রমণ। অনেক সময় ব্রাজিলের ফুল-ব্যাকরা একসঙ্গে ওপরে উঠে যান। সেই মুহূর্তে বল হারালে জাপান দ্রুত ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করতে পারে। তাই রক্ষণে ভারসাম্য বজায় রাখা খুবই জরুরি। এ ধরনের ম্যাচে আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, ধৈর্য। অনেক সময় দর্শকরা চান শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল দেখতে। কিন্তু নকআউট ম্যাচে অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো বিপদ ডেকে আনে। আমি মনে করি, ব্রাজিল প্রথমার্ধে অযথা ঝুঁকি নেবে না। তারা বলের দখল ধরে রেখে সুযোগ তৈরি করবে। অন্যদিকে জাপান অপেক্ষা করবে ব্রাজিলের ভুলের।

আমার অভিজ্ঞতা বলে, বড় টুর্নামেন্টে ব্যক্তিগত মেধা আর দলগত শৃঙ্খলার লড়াইয়ে অনেক সময় ব্যক্তিগত মেধাই শেষ কথা বলে। জাপানের দলগত সমন্বয় অসাধারণ। কিন্তু ব্রাজিলের এমন কয়েকজন খেলোয়াড় আছেন, যারা এক মুহূর্তেই ম্যাচের চিত্র পাল্টে দিতে পারেন। নেইমার সেই তালিকার প্রথম সারিতে। তবু আমি মনে করি না এটি একতরফা ম্যাচ হবে। জাপান ব্রাজিলকে দীর্ঘ সময় চাপে রাখবে, বলের জন্য লড়বে এবং সুযোগ পেলেই গোলের চেষ্টা করবে। তারা হয়তো ম্যাচের এক পর্যায়ে সমতাও ফেরাতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বড় ম্যাচে ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা, নেইমারের নেতৃত্ব এবং আক্রমণভাগের বৈচিত্র্য পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

এটি এমন একটি ম্যাচ হতে পারে, যেখানে স্কোরলাইন যতটা সহজ দেখাবে, মাঠের লড়াই তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হবে। জাপান আবারও প্রমাণ করবে তারা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সুশৃঙ্খল দল। কিন্তু নেইমারকে সঙ্গে নিয়ে ব্রাজিল শেষ পর্যন্ত সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শেষ ষোলো থেকে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করবে।