ফ্লোরিডার আর্দ্র আবহাওয়ায় মায়ামি স্টেডিয়ামের গ্যালারি রূপ নিয়েছিল কলম্বিয়ার ঘরের মাঠ ‘বারানকুইলা’র মতো। প্রায় ৬৫ হাজার দর্শকের হুঙ্কার আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর প্রতিটা টাচে দুয়োধ্বনির মাঝেই চলে দুই দলের আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ। লিওনেল মেসি কিংবা আর্লিং হালান্ডের মতো তারকারা যখন বিশ্বকাপের এই ব্যস্ত সূচিতে বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছেন, রোনালদো তখন পর্তুগালের জার্সিতে প্রতিটা ম্যাচের শেষ মিনিট পর্যন্ত খেলেছেন। প্রথম ম্যাচে কঙ্গোর বিপক্ষে হোঁচট খাওয়ার পর উজবেকিস্তানের সঙ্গে জোড়া গোল করে যিনি হুংকার দিয়েছিলেন ‘আই অ্যাম ব্যাক’, মায়ামির তপ্ত সন্ধ্যায় কলম্বিয়ার বিপক্ষে তাকে আবার গোলহীন মাঠ ছাড়তে হলো। আর এই গোলশূন্য ড্রয়ের ফলে ‘কে’ গ্রুপের রানার্সআপ হয়ে মাঠ ছাড়ল পর্তুগাল, যা তাদের নকআউটের পথকে ঠেলে দিল এক চরম অগ্নিপরীক্ষায়। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে কলম্বিয়া।
মাঠের ফুটবলে পুরো ৯০ মিনিট আধিপত্য ছিল কলম্বিয়ারই। জহন কর্দোবা ও জহন আরিয়াসের একের পর এক আক্রমণ পর্তুগিজ রক্ষণভাগকে তটস্থ করে রেখেছিল। তবে পর্তুগালের ত্রাণকর্তা হয়ে দাঁড়ান গোলরক্ষক দিয়োগো কস্তা ও ডিফেন্ডার রুবেন নেভেস। নেভেসের অবিশ্বাস্য এক গোললাইন ক্লিয়ারেন্স আর কস্তার অতিমানবীয় ছয়টি সেভ কলম্বিয়াকে গোলবঞ্চিত রাখে। ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে দাভিনসন সানচেসের হেড পর্তুগালের জালে জড়ালে গ্যালারিতে উৎসবের সুনামি বয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ভিএআর প্রযুক্তির সূক্ষ্ম কাটাকুটিতে পায়ের আঙুলের সামান্য ব্যবধানে তা অফসাইড প্রমাণিত হয়। কলম্বিয়ার এই মনকাড়া পারফরম্যান্সের পর দলটির মিডফিল্ডার হামেশ রদ্রিগেস ড্রয়ের আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা একটা দুর্দান্ত ম্যাচ খেলেছি। যখন কোনো দল আমাদের নিজেদের মতো খেলতে দেয়, আমরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আজ আমরা খুব ভালো খেলেছি, শুধু গোলটাই পাওয়া হয়নি।’
পুরো ম্যাচে কলম্বিয়ার আঁটসাঁট ডিফেন্সের সামনে কার্যত নিষ্প্রভই ছিলেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। লাতিন ডিফেন্ডারদের কড়া পাহারায় জালের সামনে গোল করার মতো তেমন কোনো সুযোগই তৈরি করতে পারেননি রোনালদো। মাঝমাঠ থেকে বলের জোগান বা পাস না পাওয়ায় বেশিরভাগ সময়ই তাকে মাঠের প্রান্তরে অলস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। ম্যাচে তার নেওয়া একমাত্র অন-টার্গেট শটটি ছিল দূরপাল্লার এক ফ্রি-কিক, যা সরাসরি কলম্বিয়ান গোলরক্ষকের গ্লাভসে জমা পড়ে। প্রথমার্ধে ব্রুনো ফার্নান্দেসের শট গোলরক্ষক ফিরিয়ে দেওয়ার পর রিবাউন্ড থেকে রোনালদোর একটি ওভারহেড কিকের প্রচেষ্টা ডিফেন্ডাররা ব্লক করে দেন। দ্বিতীয়োর্ধে জোয়াও ফেলিক্সের পাসে একবার সুযোগ পেলেও অফসাইডের ফাঁদে পড়েন ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। আক্রমণভাগের পাশাপাশি দলের রক্ষণাত্মক কাজে নিচে নেমে সহায়তা না করায় ম্যাচজুড়ে আরও একবার সমালোচকদের কাঠগড়াতেও দাঁড়াতে হচ্ছে এই মহাতারকাকে।
তবে সমালোচকদের কড়া জবাব দিয়ে পর্তুগিজ কোচ রবার্তো মার্তিনেস বলেন, ‘ক্রিশ্চিয়ানোকে অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে তুলনা করাটা অপেশাদার কাজ। ও মানসিকভাবে শক্তিশালী এবং নিজের পজিশনের ব্যাপারে দারুণ নিয়মানুবর্তী। আজ ওর ৯০ মিনিট খেলতে কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যা হয়নি।’
তবে এই ড্রয়ের চেয়েও পর্তুগিজ শিবিরের মন জুড়ে এখন এক তীব্র আবেগ। ম্যাচ শুরুর আগে স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় ভেসে ওঠে দলটির প্রয়াত ফরোয়ার্ড দিয়োগো জোতার ছবি, যিনি গত বছর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর ঠিক আগের দিনই বৃহস্পতিবার শেষ বত্রিশের ম্যাচে মাঠে নামবে পর্তুগাল। তার জন্যই বিশ্বকাপ ট্রফিটা পর্তুগালে নিয়ে যেতে চায় নেভেস-ফার্নান্দেসরা। জোতাকে নিয়ে মার্তিনেস বলেন, ‘আমরা দিয়োগো জোতার স্মৃতিকে সম্মানিত করতে চাই। আমরা তার জন্যই এই বিশ্বকাপটা জিততে চাই। এই টুর্নামেন্টে সে-ই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার আলো।’
এদিকে গ্রুপে রানার্সআপ হওয়ায় রোনালদোর পর্তুগালের নকআউট যাত্রা এখন আক্ষরিক অর্থেই কঠিন। আগামী বৃহস্পতিবার টরন্টোতে শেষ বত্রিশের হাইভোল্টেজ ম্যাচে তাদের লড়তে হবে লুকা মদ্রিচের ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে। সেই বাধা পেরোতে পারলে শেষ ১৬-তে অপেক্ষা করছে স্পেন এবং কোয়ার্টার ফাইনালে দেখা হতে পারে ফ্রান্স বা জার্মানির মতো পরাশক্তির। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা সম্পূর্ণ বিপরীত ব্র্যাকেটে থাকায় ফুটবলপ্রেমীদের আজন্ম লালিত ‘মেসি বনাম রোনালদো’ দ্বৈরথ এবারের বিশ্বকাপে কেবল ফাইনালেই সম্ভব। অপরদিকে, গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন কলম্বিয়া পরবর্তী রাউন্ডে মুখোমুখি হবে ঘানার।