মাত্র ৬ মাসে বাংলাদেশে ৩২ বার ভূমিকম্প, কী বার্তা দিচ্ছে?

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চলে মোট ৩২টি ছোট-বড় ভূমিকম্প রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই অনুভূত হয়েছে ৬টি ভূমিকম্প। যদিও ভূমিকম্পের সংখ্যা বেড়েছে, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটিকে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি হিসেবে দেখার কারণ নেই।

কোন মাসে সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প?

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথমার্ধে সবচেয়ে বেশি ১২টি ভূমিকম্প হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে। জুনে হয়েছে ৬টি, মে মাসে ৪টি এবং জানুয়ারি ও মার্চে ২টি করে ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে।

৩২টি ভূমিকম্পের মধ্যে ১৩টি ছিল মৃদু (লাইট), ৯টি মাইনর, ৮টি মাঝারি (মডারেট), ১টি খুবই মৃদু এবং ১টি ছিল তীব্র (মেজর) মাত্রার।

সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প

চলতি বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পটি হয় ২২ ফেব্রুয়ারি। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৭.১ এবং এর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে প্রায় ৩,৩৪১ কিলোমিটার দূরে।

সবশেষ ২৮ জুন রাতে ঢাকা থেকে ৩৩৪ কিলোমিটার দূরে ৪.১ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। এর আগে ২২ জুন ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে ৪.০ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল।

ঢাকার কাছাকাছি ভূমিকম্প নিয়ে উদ্বেগ

গত বছরের শুরু থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার অদূরে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বরের ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প, যার কেন্দ্র ছিল নরসিংদীর মাধবদী এলাকায়, ঢাকা থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে।

ওই ভূমিকম্পে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রাণহানি ও শতাধিক মানুষ আহত হন। একই দিনের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আরও তিনটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার বেশিরভাগের কেন্দ্রও ছিল নরসিংদী ও ঢাকার আশপাশে।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

ঢাকার কাছাকাছি ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প থেকে বড় ধরনের ভবনধস বা ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা কম। তবে এসব ভূমিকম্প মানুষকে সচেতন হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রয়েছে ঐতিহাসিকভাবে ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে সক্ষম ফল্টগুলোতে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চল, শ্রীমঙ্গল এবং বগুড়ার শেরপুর এলাকার ফল্টগুলো ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচিত।


কেন হচ্ছে এত ভূমিকম্প?

আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, ভূমিকম্পের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও এটি অস্বাভাবিক নয়। কোনো সময় বেশি, আবার কোনো সময় কম ভূমিকম্প হওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ।

এছাড়া বর্তমানে উন্নত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার কারণে আগে শনাক্ত না হওয়া ছোট মাত্রার ভূমিকম্পও এখন রেকর্ড করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ভূমিকম্পের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি মনে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভারতীয় টেকটোনিক প্লেট প্রতি বছর প্রায় ৬ সেন্টিমিটার হারে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে ইউরেশীয় প্লেটের নিচে প্রবেশ করছে। প্লেটগুলোর এই স্বাভাবিক গতিশীলতার ফলে ভূত্বকের ভেতরে চাপ সৃষ্টি হয় এবং সময় সময় বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চলে ছোট-বড় ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

কী বার্তা দিচ্ছে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘন ঘন ছোট ভূমিকম্প মানেই বড় ভূমিকম্প আসন্ন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তবে এটি মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। তাই আতঙ্ক নয়, বরং ভবন নির্মাণে বিধিমালা মেনে চলা, দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।