কংক্রিটের ব্যস্ত শহরে বর্ষার দিনগুলোতে শহরের কোণে কোণে গড়ে ওঠা একেকটি ছাদবাগানের গাছগুলো দীর্ঘদিনের তৃষ্ণা
মিটিয়ে নতুন গল্প বলতে শুরু করে। বর্ষার প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা ধুলোমাখা পাতার ওপর পড়লে গাছগুলো সতেজ হয়ে ওঠে। টবে টবে উঁকি দেয় নতুন পাতা, বৃষ্টিভেজা পাতায় জমে থাকে স্বচ্ছ জলের কণা, ভেজা মাটির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। প্রকৃতি সেজে ওঠে নতুন করে।
বর্ষায় রোপণ করার গাছ
বাংলাদেশে বর্ষাকালকে নতুন গাছ লাগানোর উপযুক্ত সময় হিসেবে ধরা হয়। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকে, মাটি সহজে শুকিয়ে যায় না, ফলে চারার ওপর অতিরিক্ত তাপের চাপ কম পড়ে। তবে নতুন চারা সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল থাকে। তাই বর্ষায় নতুন চারা গাছকে প্রথম কয়েক সপ্তাহ ভারী বৃষ্টির আঘাত থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে টবের মাটি সরে গিয়ে শিকড় যাতে উন্মুক্ত হয়ে না যায়, এ জন্য চারার গোড়ায় অতিরিক্ত মাটি যোগ হয়। জবা, গন্ধরাজ, বেলি, রঙ্গন, নয়নতারা, অপরাজিতা, কামিনীসহ বিভিন্ন ফুলগাছ বর্ষায় সবচেয়ে ভালো বেড়ে ওঠে। বর্ষায় নতুন চারা দ্রুত শিকড় বিস্তার করতে পারায় জবা, রঙ্গন কিংবা বোগেনভিলিয়ার মতো গাছের আধাপাকা ডাল কেটে রোপণ করলে সহজেই শিকড় গজায়। লেবু, পেয়ারা, ড্রাগন ফল কিংবা মাল্টার মতো ফলগাছও এ সময়ে সহজে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।
পানি নিষ্কাশন
বর্ষাকালের সবচেয়ে বড় সমস্যা বাড়ির আঙিনা কিংবা ছাদগুলোতে অতিরিক্ত পানি জমা। বৃষ্টির পানি গাছের জন্য উপকারী হলেও টানা ভারী বর্ষণে টবের মাটিতে পানি জমে থাকে। এতে গাছের শিকড় ধীরে ধীরে পচতে শুরু করে। বাইরে থেকে সবুজ দেখানো গাছও একসময় দুর্বল হয়ে যায়। তাই টবের পানি নিষ্কাশনের জন্য টবের ভেতরে ছিদ্র খোলা রাখা জরুরি। প্রয়োজনে টব কিছুটা উঁচুতে রাখতে হবে, যাতে অতিরিক্ত পানি সহজেই বের হয়ে যায়। নতুন চারায় অনেক সময় পানি দেওয়ার প্রয়োজন আছে কিনা তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। টানা বৃষ্টির দিনে অতিরিক্ত পানি না দিয়ে মাটির আর্দ্রতা পরীক্ষা করা উচিত। মাটি ভেজা থাকলে আলাদা করে পানি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ছাদবাগানের গাছ ভালো থাকার অন্যতম শর্ত ভালো মানের মাটি। বর্ষাকালে এমন মাটি প্রয়োজন, যা একদিকে আর্দ্রতা ধরে রাখবে, অন্যদিকে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন করবে। এ জন্য বাগানে ব্যবহৃত মাটির সঙ্গে জৈব সার, কোকোপিট বা সামান্য বালু মিশিয়ে গাছ লাগানো ভালো। এতে মাটি ঝরঝরে থাকে এবং শিকড়ের চারপাশে প্রয়োজনীয় বাতাস চলাচল নিশ্চিত হয়।
পুষ্টি উপাদান প্রয়োগ
অনেক সময় ভারী বর্ষণে মাটির পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয়। বৃষ্টির পানির সঙ্গে অনেক প্রয়োজনীয় উপাদান ধুয়ে যায়। ফলে গাছ বাইরে থেকে সতেজ দেখালেও ভেতরে ভেতরে পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়। তাই বর্ষাকালে গাছের সুস্থতা ধরে রাখতে জৈব সার প্রয়োগ করা জরুরি। বর্ষাকালের আর্দ্র পরিবেশ বিভিন্ন পোকামাকড়ের বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল। এরা গাছের পাতা থেকে রস শুষে নিয়ে গাছের বৃদ্ধি হওয়া ব্যাহত করে। তবে প্রজাপতি, ফড়িং, মৌমাছির মতো অনেক উপকারী পতঙ্গ ছাদবাগানের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে। এসব উপকারী পতঙ্গ দূর করতে প্রথমেই রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার না করে হাত দিয়ে সরিয়ে ফেলা ভালো। গাছের পাতায় কালো দাগ, পাতা পচে যাওয়া কিংবা পাতা ঝরে পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত আক্রান্ত পাতা ছেঁটে ফেলা বা জৈব পদ্ধতি ব্যবহার করা ভালো। নিমপাতা ভিজিয়ে তৈরি করা নিম পানি বা হালকা সাবান পানির মিশ্রণ ভাইরাস পোকা ও মিলিবাগ অপসারণ করতে কার্যকর। তবে যেকোনো জৈব দ্রবণ ব্যবহারের আগে গাছের অল্প কিছু অংশে পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো।
ঝড় মাথায় রেখে আগাম সতর্কতা
বর্ষার প্রবল ঝড়ে বড় টব উল্টে যাওয়া কিংবা ডাল ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বড় গাছের জন্য খুঁটির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী টব নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখতে হবে। দুর্বল চারাগুলোকে ছোট বাঁশের খুঁটি বা কাঠির সাহায্যে বেঁধে দিলে বাতাসে হেলে পড়া বা ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।
ছাদবাগানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচর্যা হলো নিয়মিত বাগান পর্যবেক্ষণ। ছাদবাগানের সৌন্দর্য গাছের সংখ্যার চেয়ে বেশি থাকে পরিকল্পিত পরিচর্যার মধ্যে। একটি নতুন পাতার জন্ম কিংবা প্রথম শিকড় বের হওয়ার দৃশ্য প্রত্যেক বাগানপ্রেমীদের জন্য আলাদা আনন্দ নিয়ে আসে। বর্ষার ছাদবাগান তাই প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক নীরব সহাবস্থান। এই বর্ষায় সামান্য পরিচর্চাতে বাড়ির ছোট্ট জায়গা টুকু হয়ে উঠতে পারে প্রশান্তির এক টুকরো আশ্রয়।
লেখক : শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা