ধানের নাড়ায় উর্বরা হবে মাটি

জৈব পদার্থ মাটির অন্যতম একটি উপাদান। গাছপালা ও জীবজন্তুর মৃতদেহ মাটিতে পচে যে পদার্থের সৃষ্টি হয় তাকে জৈব পদার্থ বলে। একটি প্রাচীন তামিলনাড়ু (Tamilnaddu) প্রবাদ আছে, ‘জমি চাষ করা অপেক্ষা সেখানে জৈব পদার্থ প্রয়োগ করা শ্রেয়’। আবার বলা হয় যে, জৈব পদার্থই মাটির প্রাণ। জৈব পদার্থ মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাবলির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মাটির উৎপাদিকা শক্তি এর জৈব পদার্থের পরিমাণের সঙ্গে সম্পর্কিত।

প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

উৎপাদনশীল মাটিতে কমপক্ষে শতকরা ৫ ভাগ জৈব পদার্থ থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ শতকরা ২ ভাগের কম। তার ওপর উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ফসলের আবাদ, নিবিড় চাষাবাদ ও মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে আমাদের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে। তা ছাড়া উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর কারণেও এদেশের মাটির জৈব পদার্থ দ্রুত অবক্ষয় হয়ে যায়। ক্রমে মাটিতে এর পরিমাণ কমে যাওয়ার দরুণ মাটির উৎপাদিকা শক্তি হ্রাস পাচ্ছে। তাই মাটির উৎপাদিকা শক্তি সংরক্ষণ ও বৃদ্ধির জন্য মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করা অত্যাবশ্যক।

জৈব পদার্থের উৎস

কৃত্রিম জৈব পদার্থের উল্লেখযোগ্য উৎস হচ্ছে গোবর, আবর্জনা পচা সার, খৈল ও সবুজ সার। দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে গোবর দিয়ে ঘুটে (Dung Cake) তৈরি করে জ্বালানির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। আবর্জনা সার প্রচুর পরিমাণে তৈরি করা হয় না এবং খৈলের দামও বেশি হওয়ায়, এগুলো খুব কমই প্রয়োগ করা হয়। আবার সবুজ সারের ব্যবহারও তথৈবচ। তাই এ দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে উপযুক্ত কোনো উৎস থেকে মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করার চিন্তা এবং সে অনুযায়ী বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সমাধান হতে পারে ধানের নাড়া

জৈব পদার্থ সরবরাহের ক্ষেত্রে ধানের নাড়ার (ধান গাছ কাটার পর যে অংশ মাটিতে থাকে) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য ফসল। এ দেশের মোট আবাদি জমির শতকরা প্রায় ৭৫-৮০ ভাগ জমিতেই ধানের চাষ হয়ে থাকে। আগে ধান কাটার পর এর নাড়া জমিতে পড়ে থাকত এবং তা পচে জমিতে জৈব পদার্থ (Organic Matter) যোগ হতো। দুর্ভাগ্যবশত আজকাল তা আর জমিতে পড়ে থাকছে না, এখন এগুলো শিকড়সহ উৎপাটন করে জ্বালানি কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। তা ছাড়া অনেক কৃষক জমি তৈরির সময় ধানের নাড়াকে আগাছার মতো তুলে জমির আইলের ওপর কিংবা জমির এক কোনায় স্তূপ করে রেখে দেন। তা ছাড়া এগুলো জমিতে যথাযথভাবে পচানো হয় না বলে এ মূল্যবান জৈব দ্রব্যটি নষ্ট হয়।

প্রকৃতপক্ষে গাছেই জৈব পদার্থ সৃষ্টি হয় এবং গাছই সূর্যশক্তি সঞ্চয় করার প্রধান মাধ্যম। গাছের শিকড় মাটির ভেতরে বাড়ে এবং বয়সের সঙ্গে মারা যায়। এই শিকড়ই মাটিতে বসবাসকারী জীবাণুদের খাদ্য ও শক্তি সরবরাহ করে। পচনের ফলে বিশ্লেষিত হয়ে এই শিকড়ই হিউমাস গঠনের উপকরণ মাটিতে সরবরাহ করে (মুখোপাধ্যায়, ১৯৮৪। মৃত্তিকা বিজ্ঞান। সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, কলকাতা-৯)।

ধান গাছের গোড়ায় দস্তা এবং গন্ধক উল্লেখযোগ্য পরিমাণে জমা থাকে। তাই ধান গাছের শিকড় ও মাটির উপরিভাগের অংশ অর্থাৎ নাড়াকে জ্বালানির কাজে ব্যবহার না করে কিংবা জমি থেকে তুলে ফেলে না দিয়ে, বৈজ্ঞানিক উপায়ে জমিতে পচানোর (Decomposition) ব্যবস্থা করলে জমিতে গন্ধক ও দস্তা সারের ঘাটতি যেমন পূরণ হবে, তেমনি জৈব পদার্থ সরবরাহের ক্ষেত্রে এক অনন্য ভূমিকা পালন করবে। তা ছাড়া ধানের নাড়ায় উচ্চমাত্রার পটাশিয়াম (১.৬%) থাকে। তাই ধানের নাড়া একটি উত্তম পটাশিয়াম সমৃদ্ধ জৈব সার হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। অধিকন্তু ধানের নাড়ায় নাইট্রোজেন (০.৫%) ও ফসফরাস (০.০৮%) রয়েছে। ধানের জমিতে নাড়া প্রয়োগ করে মাটিতে জৈব পদার্থ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি ধানের ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব। জমিতে চাষ দিয়ে নাড়া মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে ও পচিয়ে তারপর ধানের চারা রোপণ করা হলে মিথেন নিঃসরণ অনেক কমে। (রায়, ২০২৩। পরিবেশবান্ধব ধান চাষ। ঐশ্বর্য প্রকাশ, শাহবাগ, ঢাকা)।

নাড়া পচানোর সময়

সারা বছরই নাড়া পচানো যায়। তবে বর্ষাকালই নাড়া পচানোর জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী সময়। নাড়া যখন উত্তমরূপে পচে যাবে, তখন পরবর্তী ফসলের বীজ বপণ বা চারা রোপণ করতে হবে।

নাড়া মাটিতে পচানো পদ্ধতি

মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পর বা জমিতে পানি সেচ দিয়ে পরে জমির ‘জো’ বুঝে জমি চাষ দিয়ে নাড়া মাটিতে মিশিয়ে পচানোর কাজ শুরু করতে হবে। প্রথমে লাঙ্গলের সাহায্যে জমিতে ১/২টি গভীরভাবে সোজাসুজি ও আড়াআড়িভাবে চাষ দিয়ে নাড়া মাটির সঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে দিতে হবে। এ সময় হেক্টরপ্রতি ১৫ কেজি ইউরিয়া সার সব জমিতে ভালো করে ছড়িয়ে দিতে হয়। এতে নাড়ার পচনের কাজ সহজতর হয়। তারপর আরও ১টি চাষ ও মই দিয়ে নাড়াগুলো মাটির নিচে চাপা দিয়ে জমি বেশ সমতল করে ৭-৮ দিন ফেলে রাখতে হবে। ৭-৮ দিন পর পুনরায় জমি সোজাসুজি ও আড়াআড়িভাবে ২-৩টি চাষ ও মই দিয়ে নাড়াগুলো কাদাময় মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। এগুলো জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মাটিতে পচবে। এই জৈবিক পচন শেষ হতে অন্তত ১০-১৫ দিন সময় লাগে।

নাড়া দ্রুত পচনের জন্য প্রয়োজন মাটিতে যথেষ্ট রস, অনুকূল তাপমাত্রা এবং মাটির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। ধানের নাড়ায় জটিল শ্বেতসার (সেলুলোজ, লিগনিন)-এর পরিমাণ বেশি ও নাইট্রোজেন খুব কম, ফলে এর পচনে অনেক বেশি সময় নেয়। মাটিতে রসের ভাগ কম হলে বা বায়ুর কম তাপমাত্রায় এর পচনে বিলম্ব ঘটে।

নাড়া জীবাণু ঘটিত পচনের ফলে জমিতে প্রচুর পরিমাণে জৈব পদার্থ যোগ হয়। মাটির ওপরের এক হেক্টরে উৎপাদিত দানাশস্যের শিকড় ৫ থেকে ১০ হাজার কেজি পর্যন্ত শুকনো জৈব পদার্থ সৃষ্টি করে

(মুখোপাধ্যায়, ১৯৮৪। মৃত্তিকা বিজ্ঞান। সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, কলকাতা-৯)। মাটির মধ্যে থাকা শিকড়ের ওজন যদি ওপরের অংশের অর্ধেকও ধরা হয় তাহলে দেখা যাবে কি বিপুল পরিমাণে শিকড় মাটিতে জৈব পদার্থ সরবরাহ করে। যেমন শিকড়, তেমনি গাছের উপরিভাগের জৈববস্তু (Biomass) পচনের যোগে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এই জৈব পদার্থ সহজে ক্ষয় হয়ে পরে অত্যন্ত জটিল যৌগ পদার্থে পরিণত হয়, তাকে হিউমাস বলে। এই হিউমাস মাটির একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদানে পরিণত হয় এবং মাটির ভৌতিক (চযুংরপধষ) ও রাসায়নিক গুণাবলি এবং জীবাণুদের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। যেহেতু উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর কারণে আমাদের দেশের মাটির জৈব পদার্থ তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। ধান গাছের নাড়া মাটিতে মিশিয়ে পচানোর অন্যতম উদ্দেশ্য মাটির অভ্যন্তরে হিউমাসের মজুদ ঠিক রাখা এবং সম্ভব হলে এর পরিমাণ বৃদ্ধি করা।

বাংলাদেশের কৃষির সঙ্গে সামঞ্জস্যতা

জমিতে নাড়া পচানোর কতিপয় বিশেষ সুবিধা রয়েছে। যেমন

১. এতে কোনো খরচ নেই।

২. জমি প্রস্তুত করার সময় একই চাষ ও একই শ্রমে নাড়া মাটিতে পচানো যায়।

৩. জমিতে নাড়া পচানো অত্যন্ত সহজ কাজ। সব চাষির জন্যই এ পদ্ধতি অত্যন্ত উপযোগী।

এ কারণে ধানের নাড়ার সাহায্যে মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করার ব্যবস্থা আমাদের দেশের জন্য খুব উপযোগী।

আমাদের দেশে ধানের নাড়া জৈব পদার্থের একটি সুলভ ও উৎকৃষ্ট উৎস। তাই একে জ্বালানির কাজে ব্যবহার না করে কিংবা জমি থেকে তুলে ফেলে না দিয়ে বরং ধান কাটার সময় জমিতে রেখে গোড়া থেকে ২০-২৫ সে.মি. ওপরে কেটে, পরে চাষ দিয়ে জমির মাটির সঙ্গে মিশিয়ে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন।

লেখক : উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (অব.), উপজেলা কৃষি অফিস, রূপসা, খুলনা