মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন মুদ্রানীতি

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ড. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে নতুন মুদ্রানীতি উপস্থাপন করেন ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান।

মুদ্রানীতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ, ১৯৭২ (২০০৩ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য হলো মূল্যস্ফীতি নিম্ন ও স্থিতিশীল পর্যায়ে রাখা। এর মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রকৃত বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে, বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক চাপ, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং জনগণের আস্থাহীনতার মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সরকার আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির প্রভাব থেকে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার নীতিতে অটল রয়েছে।

মুদ্রানীতিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে রপ্তানিমুখী ও বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে। এ লক্ষ্য অর্জনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কঠোর মুদ্রানীতির ফলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ১১ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছানো পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালের মে মাসে কমে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।

তবে মূল্যস্ফীতি কমার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছে বলে স্বীকার করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করতে সরকার রাজস্ব ও মুদ্রানীতিতে সমন্বিত প্রণোদনা গ্রহণ করেছে। সেই অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নির্ধারিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে।

মুদ্রানীতিতে বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া দেশীয় অর্থনীতির সামনে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের চাপ, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশ অতিরিক্ত চাহিদাজনিত নয়; বরং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারের কাঠামোগত সমস্যার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করেই মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ খেলাপি ঋণ, সরকারের ঋণগ্রহণ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে ২০২৬ সালের মে মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে উদ্বৃত্ত তারল্যের একটি বড় অংশ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হয়ে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আশা প্রকাশ করেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সরকারের রাজস্ব নীতির সঙ্গে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে আগামী মাসগুলোতে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের গতি আরও শক্তিশালী হবে।