জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে তিন অভিযোগে পৃথকভাবে ১০ বছর করে ৩০ বছর সশ্রম কারাদন্ডাদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তবে, রায়ে বলা হয়েছে আসামির বিরুদ্ধে আরোপিত সব সাজা যুগপৎ চলবে অর্থাৎ ইনুকে ১০ বছর কারাবাস করতে হবে। পাশাপাশি দুই পৃথক অভিযোগে তাকে ১ লাখ করে ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় দেয়। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায় ঘোষণার সময় হাসানুল হক ইনু কাঠগড়ায় ছিলেন। রায় বিটিভির মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
গত ১৪ মে মামলাটির সবশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে যে কোনো দিন রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখে ট্রাইব্যুনাল। এরপর গত ২২ মে রায়ের জন্য এদিন (৩০ জুন) ধার্য করে আদালত। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় প্রসিকিউশন বলেছে, সাজা অপর্যাপ্ত হয়েছে বিধায় সাজা বাড়াতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করা হবে। অন্যদিকে রায়ে সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হাসানুল হক ইনু ও তার আইনজীবীরা।
২০২৪-এর অভ্যুত্থানে ব্যাপক হত্যাকা- ও নির্যাতনের অভিযোগের বিচারে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এটি ষষ্ঠ রায় এবং ট্রাইব্যুনাল-২ এর এটি তৃতীয় রায়। এ মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগে তার সাজা হয়। পাঁচটি অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়।
কোন কোন অপরাধে সাজা : ৩ নম্বর অভিযোগে সাক্ষী রাইসুল হকসহ (এ মামলার সাক্ষী) ভুক্তভোগীদের রাজনৈতিক নিপীড়ন, নির্যাতন ও আহত করার দায়ে ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে।
৬ নম্বর অভিযোগে অপরাধের ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা ও দুষ্কর্মে সংযোগের দায়ে তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ডের পাশাপাশি ১ লাখ টাকা অর্থদন্ড দেওয়া হয়েছে।
৭ নম্বর অভিযোগে অপরাধের ষড়যন্ত্রে সম্মতি দেওয়ায় ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ডের পাশাপাশি ১ লাখ টাকার অর্থদন্ড দেওয়া হয়েছে রায়ে।
তবে, ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এসব অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয় ট্রাইব্যুনাল।
এর মধ্যে ১ নম্বর অভিযোগ : ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জুলাই আন্দোলনকারীদের জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক আখ্যা দেন ইনু। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের উসকানি, প্ররোচনা, সহায়তা এবং হত্যারও নির্দেশ দেন তিনি।
২ নম্বর অভিযোগ : ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কারফিউ জারি করে ‘শুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়া।
৪ নম্বর অভিযোগ : আন্দোলনকারীদের ঘেরাও করে ছত্রীসেনা হেলিকপ্টার থেকে বম্বিং এবং মারণাস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা করা।
৫ নম্বর অভিযোগ : গণমাধ্যমে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে হত্যাকা- সংঘটনে সমর্থন করা।
৬ নম্বর অভিযোগ : ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই ১৪ দলীয় জোটের সভায় উপস্থিত থেকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
৮ নম্বর অভিযোগ : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনরত কিশোর আব্দুল্লাহ আল মুস্তাকিনসহ ছয়জনকে হত্যার নির্দেশনা দেওয়া।
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন অনুযায়ী এই সাজার বিরুদ্ধে এক মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার সুযোগ পাবেন তিনি।
ট্রাইব্যুনালে যা হলো : দুপুর ১টা ৪৪ মিনিটে হালকা ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি ও পাজামা পরিহিত হাসানুল হক ইনুকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করে পুলিশ। তবে, তাকে হাজতখানা থেকে এজলাসে নিয়ে আসার সময় এক পুলিশ সদস্য তার হাত ধরতে চাইলে ওই পুলিশকে ধমক দেন ইনু। এজলাসে ঢুকে হাস্যোজ্জল ইনু তার আইনজীবীদের উদ্দেশে হাত নাড়েন। এর একটু আগে ইনুর স্ত্রী আফরোজা হক রীনা রায় শুনতে ট্রাইব্যুনালে আসেন। সংক্ষিপ্ত রায়টি তিন বিচারক পড়ে শোনান। সাজা-সংক্রান্ত রায়ের অংশ পড়ে শোনান বিচারিক প্যানেলের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী।
ফরমায়েশি রায়ের নিন্দা করি ইনু : রায়ের পর পরই ইনুকে হাজতখানায় নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীনতা এনেছি। এই ফরমায়েশি রায়ের আমি নিন্দা করি।’ তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের আমলে ফরমায়েশি রায়ে আমাকে সাজা দেওয়া হয়েছিল। তারেক রহমানের আমলে ফরমায়েশি রায়ে আরেকবার সাজা দেওয়া হলো।’ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ইনুর স্ত্রী আফরোজা হক রীনা সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি নিকৃষ্টতম অবিচার। আইনজীবী এবং দল বসে আমরা পরবর্তী আইনি সিদ্ধান্ত নেব।’
যা বললেন চিফ প্রসিকিউটর : রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই রায়ে আমরা মোটেও সন্তুষ্ট নই। আমরা মনে করি, তিনি (ইনু) তার যে অপরাধমুলক কর্মকা-ে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে ট্রাইব্যুনাল যে সাজা দিয়েছে, আমরা মনে করি, তারা যথাযথভাবে সাক্ষীর সাক্ষ্য পর্যালোচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এই সাজা অপ্রতুল। সাজা বৃদ্ধির জন্য আমরা আপিল করব।’
যেভাবে বিচারের আওতায় ইনু : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একই বছরের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ তদন্ত শুরু করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তদন্ত শেষে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিল হয়। গত বছরের ২ নভেম্বর এ মামলায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। এরপর ৩০ নভেম্বর প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। বিচারকালে ইনুর বিরুদ্ধে ১০ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। আর ইনুর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য হয় দুজনের। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গত ২ এপ্রিল আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়। এরপর শুনানি করে প্রসিকিউশনপক্ষ। ইনুর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। প্রসিকিউশন পক্ষে আসামির বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ।