নতুন ফরম্যাটের ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের মতো অঘটন। গ্রুপ পর্বের খোলস পেরিয়ে রাউন্ড ৩২-এ পুড়ে ছাই হয়ে গেল ইউরোপীয় ফুটবলের দুই পরাশক্তি জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের বিশ্বকাপ স্বপ্ন। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে টাইব্রেকারে স্তব্ধ করে দিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দল প্যারাগুয়ে। অন্যদিকে তিনবারের রানার্সআপ ডাচদের টাইব্রেকারের স্নায়ুযুদ্ধে হারিয়েছে আফ্রিকার সিংহ মরক্কো। ইয়ুর্গেন ক্লিনসমান একে ‘চরম লজ্জার’ বলে বর্ণনা করেছেন।
পেনাল্টি জুজুতে পুড়ল নাগেলসম্যানের দল : বিশ্বকাপের ইতিহাসে জার্মানি কখনো টাইব্রেকারে হারেনি এমন এক অজেয় রেকর্ড বস্টনের মাঠে গুঁড়িয়ে দিল প্যারাগুয়ে। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ গোলে সমতায় থাকার পর, পেনাল্টি শুটআউটে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে যায়।
ম্যাচের শুরু থেকেই বল পজিশন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল জার্মানি। প্রথমার্ধে যেখানে জার্মানি ২৪৪টি পাস খেলে, সেখানে প্যারাগুয়ে খেলে মাত্র ৩১টি। কিন্তু ফরোয়ার্ড ডেনিজ উন্দাভ ও কাই হাভার্টজদের সব আক্রমণ প্যারাগুয়ের রক্ষণ দেওয়ালে মাথা কুটে মরেছে। উল্টো ৩৫ মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে দানিলোর ভুল পাসের সুযোগ নিয়ে দুর্দান্ত এক হেডে প্যারাগুয়েকে এগিয়ে নেন হুলিও এনসিসো। বিস্ময়ের হলো, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এই প্রথম গোল করলেন প্যারাগুইয়ানরা।
বিরতির পর ৫৪ মিনিটে ফ্লোরিয়ান উইর্টজের ক্রস থেকে হেডে গোল করে জার্মানিকে সমতায় ফেরান কাই হাভার্টজ। অতিরিক্ত সময়ের ১০২ মিনিটে জোনাথান তাহের হেডে জার্মানি জয়ের আনন্দে মাতলেও, ভিএআর দীর্ঘ রিভিউ শেষে গোলরক্ষককে ফাউল করার অপরাধে গোলটি বাতিল করে দেয়। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে জার্মানির কাই হাভার্টজ, নিক ভোল্টমেডের শট বাঁচিয়ে দেন দীর্ঘদেহী গোলরক্ষক অরলান্দো হিল। এবং জোনাথান তাহ গোল করতে ব্যর্থ হন। শেষ শটে প্যারাগুয়ের হোসে ক্যানালে লক্ষ্যভেদ করতেই বস্টনের স্টেডিয়ামে রূপকথার জয় উদযাপনে মাতে দক্ষিণ আমেরিকানরা। ২০১০ সালের পর বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে না পারা প্যারাগুয়ের ফুটবল ইতিহাসে এটিই অন্যতম সেরা জয়।
মন্তেরিতে রক্ষণের চড়া মূল্য চুকালো ডাচরা : অন্য ম্যাচে, মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলের চরম এক লড়াইয়ে নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে ৩-২ ব্যবধানে বিদায় করে দিল মরক্কো। গ্রুপ পর্বে ১০ গোল করা ডাচদের জন্য কোচ রোনাল্ড কুমান হুট করেই ৫ জনের ডিফেন্স লাইনের এক রক্ষণাত্মক ছক (৫-৩-২) সাজিয়েছিলেন, যা দলের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
ম্যাচের ৭২ মিনিটে লিভারপুল তারকা কোড গাকপো গোল করে ডাচদের ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। গোলটি ছিল আবেগে জড়ানো, কারণ ম্যাচের ঠিক আগেই গাকপো ও তার সঙ্গী তাদের অনাগত সন্তানকে হারান। গোল করার পর আকাশের দিকে আঙুল উঁচিয়ে কেঁদে ফেলেন গাকপো, পুরো দল তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেয়।
কিন্তু ফুটবল যে নিষ্ঠুর! ম্যাচের যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে (৯১ মিনিটে) মরক্কোর বদলি খেলোয়াড় শেমসদিন তালবির ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডে গোল করে স্টেডিয়ামে আগুন জ্বালিয়ে দেন ইসা দিওপ। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময় ছাড়িয়ে টাইব্রেকারে।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের টাইব্রেকার হিরো গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু এবারও ডাচদের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান। ডাচ তারকা ক্রিসেনসিও সামারভিলের পঞ্চম পেনাল্টি শটটি সোজা রুখে দেন বুনু। এরপর ইসমায়েল সাইবারি ঠাণ্ডা মাথায় গোল করে মরক্কোকে নিয়ে যান শেষ ১৬-তে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ কানাডা।
টিকে থাকলে কোয়ার্টার ফাইনালে দেখা হতে পারত জার্মানি-নেদারল্যান্ডসের, যা হতো ১৯৭৪ সালের ফাইনালের পুনরাবৃত্তি। কিন্তু দুদলের বিদায়ে সুবিধা হয়ে গেছে ফ্রান্সের। গত রাতে তারা সেনেগালকে হারিয়ে থাকলে শেষ ষোলোতে প্যারাগুয়ের মুখোমুখি হবে। নেদারল্যান্ডস না থাকায় মরক্কোর পথ হয়েছে অনেকটাই সহজ। শেষ ষোলোতে তাদের প্রতিপক্ষ কানাডা।