অবৈধ দখল ও ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে কক্সবাজারের চকরিয়ার বনভূমি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। বন বিভাগের আওতাধীন ৪২ হাজার ৭২১ একর বনাঞ্চলের অন্তত ৪০ শতাংশ ইতিমধ্যে বেদখল হয়ে গেছে। পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন, কৃষি ও ফলের বাগান সম্প্রসারণ, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং দীর্ঘদিনের দখলদারির কারণে সংকুচিত হচ্ছে বনের পরিধি। এর ফলে জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
সরেজমিনে চকরিয়ার হারবাং, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, খুটাখালী এবং এর সংলগ্ন বনাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ধাপে ধাপে বনভূমি দখলের একটি প্রবণতা গড়ে উঠেছে। সরকারি কোনো হালনাগাদ ও সমন্বিত পরিসংখ্যান না থাকলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, বনভূমির ক্ষয় উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জে রয়েছে ১৩ হাজার ৬০১ একর বনভূমি। ফুলছড়ি রেঞ্জে বনভূমির পরিমাণ ৯ হাজার ৯৩৮ একর, যার মধ্যে ৯ হাজার ১০৩ একর সংরক্ষিত বন এবং ৮৩৫ একর রক্ষিত বনভূমি। অন্যদিকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের আয়তন ১৯ হাজার ১৮২ একর। সব মিলিয়ে চকরিয়া বন বিভাগের আওতাধীন এ তিনটি বনাঞ্চলের মোট আয়তন ৪২ হাজার ৭২১ একর। বন বিভাগ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এই বিপুল বনভূমির অন্তত ৪০ শতাংশ ইতিমধ্যে বিভিন্নভাবে দখল হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রায় ১৭ হাজার একরের বেশি বনভূমি এখন ঝুঁকির মুখে। কোথাও পাহাড় কেটে বসতি গড়ে উঠেছে, কোথাও কৃষিজমি ও ফলের বাগান সম্প্রসারণ করা হয়েছে, আবার কোথাও বনভূমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও অন্যান্য স্থাপনা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বনভূমি দখলের একটি নির্দিষ্ট ধারা রয়েছে। প্রথমে গোপনে গাছ কেটে জমি ফাঁকা করা হয়। এরপর বাঁশ, টিন বা প্লাস্টিক দিয়ে অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করে দখল নিশ্চিত করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘর স্থায়ী রূপ নেয়। পরে সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ, দোকানপাট, গুদাম এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে ওঠে। একসময় বনভূমি পুরোপুরি জনবসতি ও র্অনৈতিক কর্মকা-ের এলাকায় পরিণত হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বনভূমি দখলের পেছনে প্রভাবশালী একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। ভূমি ব্যবসায়ী, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং অসাধু গোষ্ঠীর সদস্যরা প্রথমে দরিদ্র মানুষকে বসতি স্থাপনে ব্যবহার করেন। পরে সেই জমি প্লটিং, বিক্রি কিংবা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) চকরিয়া উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আলা উদ্দিন আলো বলেন, চকরিয়ার অন্তত ৪০ শতাংশ বনভূমি অন্যদের দখলে রয়েছে। বনভূমি দখল এখন একটি গভীর পরিবেশগত সংকটে পরিণত হয়েছে। কার্যকর নজরদারি, প্রশাসনিক সদিচ্ছা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফুলছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমান বলেন, বনভূমি রক্ষায় নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান, টহল ও নজরদারি পরিচালনা করা হচ্ছে। দখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। তবে বনাঞ্চলের বিস্তৃতি, জনবল সংকট এবং উচ্ছেদের পর পুনরায় দখলের প্রবণতা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা আবির হাসান বলেন, বনভূমি দখল প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু সীমিত জনবল ও বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলের কারণে সব এলাকায় একযোগে নজরদারি করা সম্ভব হয় না।