‘ব্রিটেনে এসে প্রথমবার মানুষের হাসি দেখেছি’

মাত্র ১৫ বছর বয়সেই জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল আমাল সাহেলকে (ছদ্মনাম)। যে বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা আর ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর থাকার কথা, সে বয়সেই তাকে দেখতে হয়েছে রক্তাক্ত বন্ধুদের মৃত্যু। এরপর একের পর এক মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা, যুদ্ধের ভয়াবহতা, জোরপূর্বক যুদ্ধে পাঠানোর চেষ্টা, সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে ডুবে মরার আশঙ্কা, এমনকি গুলির মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে। দীর্ঘ সেই দুঃসহ পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনে পৌঁছে তিনি অনুভব করেন বহুদিন পর মানুষের মুখে হাসি দেখার স্বস্তি।

সাহেল জানান, যুদ্ধ শুরুর আগে ইয়েমেনে তার জীবন ছিল একেবারেই অন্যরকম। তার বাবা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। পরিবার নিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতেন। সুন্দর পাহাড়-পর্বত, মনোরম আবহাওয়া এবং মানুষের আন্তরিকতার কারণে তিনি ইয়েমেনকে উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর একটি বলে মনে করতেন।

কিন্তু ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মুহূর্তেই বদলে যায় সবকিছু। সাহেল বলেন, গৃহযুদ্ধের প্রথম দিন সকালে ঘুম ভেঙেছিল বোমা বিস্ফোরণের শব্দে। পরে ধীরে ধীরে পুরো দেশ যুদ্ধের ভয়াবহতায় ডুবে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে গত বছরের যুদ্ধবিরতির আগে পর্যন্ত চলা সংঘাতে তিন লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই পশ্চিম ইয়েমেনে অবস্থিত তার শহরটি হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। চারদিকে অস্ত্রধারীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। রাস্তাঘাট ভরে যায় অস্ত্র ও যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষে। সাহেল বলেন, অনেক দিন বাইরে বের হলে দেখতেন বোমার আঘাতে চারপাশের বালু পর্যন্ত কালো হয়ে গেছে।

এমন পরিস্থিতিতেই ঘটে তার জীবনের প্রথম বড় ট্র্যাজেডি। একদিন তিনি ও তার কয়েকজন বন্ধু রাস্তায় পড়ে থাকা একটি লম্বা ধাতব বস্তু খুঁজে পান। যুদ্ধের কারণে চারপাশে এ ধরনের ধাতব টুকরো প্রায়ই পড়ে থাকতে দেখতেন তারা। তাই সেটিকে বিপজ্জনক কিছু না ভেবে খেলনা তলোয়ার বানিয়ে খেলতে শুরু করেন।

সাহেল বলেন, তার এক বন্ধু সেটি হাতে নিয়ে তলোয়ারের মতো ঘোরাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর বক্সিং অনুশীলনে যাওয়ার জন্য তিনি সেখান থেকে চলে যান। বাড়িতে পৌঁছানোর অল্প সময় পরই বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান।

তিনি বলেন, সঙ্গে সঙ্গে বাইরে দৌড়ে গিয়ে দেখেন চারদিকে রক্তাক্ত অবস্থায় বন্ধুরা ছুটছে। একজন দৌড়ে এসে তার সামনেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আরেকজনের গলায় বোমার ধাতব টুকরা ঢুকে যায়। সাহেলের ধারণা, তখনই তার মৃত্যু হয়েছিল। পরে জানা যায়, তারা যেটি নিয়ে খেলছিল সেটি আসলে একটি অবিস্ফোরিত বোমা ছিল।

সাহেল বলেন, তারা দ্রুত গাড়ির ব্যবস্থা করে সবাইকে হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রায় দুই ঘণ্টা পর চিকিৎসকেরা এসে জানান, তার তিন বন্ধুই মারা গেছে। তিনি বলেন, তখন তার কোনো অনুভূতিই হচ্ছিল না। কারণ এত বড় ঘটনা তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।

এটাই ছিল তার জীবনের প্রথম মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া। এরপর আরও তিনবার এমন পরিস্থিতি আসে, যখন অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।

যুদ্ধ যত দীর্ঘ হতে থাকে, শহরের রাস্তায় তত বেশি অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর উপস্থিতি বাড়তে থাকে। কিন্তু সাহেল চেষ্টা করতেন সবকিছু উপেক্ষা করে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে। তার স্বপ্ন ছিল একদিন নিজের ব্যবসা গড়ে তোলা। পাশাপাশি তিনি খণ্ডকালীন ফটোগ্রাফার ও মডেল হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু এই কাজই একসময় তার জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একদিন একটি পার্কে ফটোশুটের প্রস্তুতি চলার সময় হুথি বিদ্রোহীরা অস্ত্র হাতে সেখানে হাজির হয়। তারা সাহেলকে গুপ্তচর বলে অভিযোগ তোলে। তাদের দাবি ছিল, তিনি সামরিক স্থাপনার ছবি তুলে বিদেশিদের কাছে পাঠাচ্ছেন।

সাহেল জানান, বিদ্রোহীরা তার ক্যামেরা নিয়ে ছবিগুলো দেখেছিল। সেখানে সন্দেহজনক কিছু না পেলেও তাকে একটি সামরিক ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং মারধর করা হয়।

তিনি বলেন, তারা বারবার বলছিল, তিনি ইংরেজি বলতে পারেন। তাই নিশ্চয়ই যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করেন এবং তাদের জন্য ছবি তোলেন।

এরপর তারা তাকে নিজেদের দলে যোগ দিয়ে সৈনিক হওয়ার প্রস্তাব দেয়। সাহেল তাদের বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তিনি একজন সাধারণ নাগরিক এবং কোনো পক্ষের হয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে চান না। কিন্তু বিদ্রোহীরা তাকে জানায়, তাদের সঙ্গে না থাকলে তিনি শত্রুপক্ষের লোক হিসেবে বিবেচিত হবেন। তাই তাকে তাদের হয়েই যুদ্ধ করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত তাকে ছেড়ে দেওয়া হলেও বিপদ শেষ হয়নি। এরপর বারবার তার বাড়িতে লোক পাঠিয়ে তাকে বিদ্রোহী বাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়।

তারা তাকে বলেছিল, তিনি শিক্ষিত, ভালো কথা বলতে পারেন। তাই তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হবে না, প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হবে এবং নিরাপদ রাখা হবে। কিন্তু সাহেল জানতেন বাস্তবতা ভিন্ন। তিনি দেখেছেন, ১৪ বছর বয়সী শিশুদেরও যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে। পরে তাদের মরদেহ পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে, তারা জান্নাতে চলে গেছে। তাই তিনি বুঝে যান, দেশে থাকলে একসময় তাকেও যুদ্ধে যেতে বাধ্য করা হবে।

২০২৩ সালে ২১ বছর বয়সে তিনি ইয়েমেন ছেড়ে মিসরে চলে যান। সে সময় ইয়েমেনিদের জন্য ভিসা ছাড়া প্রবেশ করা যেত এমন অল্প কয়েকটি দেশের একটি ছিল মিসর। কিন্তু মিসরেও তিনি নিরাপদ ছিলেন না। তার দাবি, সেখানে বারবার তাকে ইয়েমেনে ফেরত পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি গুরুত্ব পেত না যে দেশে ফিরলে তার জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই পরিণতির মুখে পড়েছেন তার অনেক বন্ধুও।

এরপর বন্ধুদের পরামর্শে তিনি ইউরোপে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাকে বলা হয়েছিল, তুরস্ক থেকে গ্রিসে নৌকায় যেতে মাত্র ১৫ মিনিট লাগে। কিন্তু বাস্তবে সেই যাত্রাই তার জীবনের তৃতীয় মৃত্যুঝুঁকিতে পরিণত হয়। মানবপাচারকারীর নৌকায় করে যাওয়ার সময় গ্রিক কোস্টগার্ডের নজর এড়াতে যাত্রীদের মাঝপথে পানিতে নেমে সাঁতরে তীরে যেতে বলা হয়।

সাহেল নিরাপদে তীরে পৌঁছালেও দেখেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ও একটি কিশোর ডুবে যাচ্ছে। এক মুহূর্তও দেরি না করে তিনি আবার পানিতে ঝাঁপ দেন। তিনি বলেন, ওই কিশোরের বয়স ছিল ১৬ বা ১৭ বছর। তার শরীর ভারী ছিল এবং সে সাঁতার জানত না। বাঁচার চেষ্টা করতে গিয়ে সে বারবার সাহেলের মাথা পানির নিচে চেপে ধরছিল। এতে সাহেল নিজেও ডুবে যাওয়ার উপক্রম হন।

তিনি বলেন, সেদিন তিনি নিজের চোখে মৃত্যুকে দেখেছিলেন। পরে কৌশলে কিশোরটির পেছনে গিয়ে তাকে ঠেলে ঠেলে তীরে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। তীরে ওঠার পর ওই দুইজনসহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে তিনি পাঁচ ঘণ্টা পাহাড়ি পথ হেঁটে একটি পুলিশ স্টেশনে পৌঁছান।

সাহেলের দাবি, সেখানে তাদের কোনো আশ্রয় দেওয়া হয়নি। বরং রাস্তায় ঘুমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর তিনি প্রায় তিন মাস গ্রিসে ছিলেন। কিন্তু সেখানে নিজেকে সবসময় অপরাধীর মতো মনে হতো। তার বন্ধুদের অনেকে তাকে জানিয়েছিল, ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে আশ্রয় পাওয়া কঠিন, তবে যুক্তরাজ্যে এখনও সেই সুযোগ রয়েছে।

এ কারণে ২০২৪ সালের শেষ দিকে তিনি ফ্রান্সের কালে শহরে যান। উদ্দেশ্য ছিল ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে যুক্তরাজ্যে যাওয়া। ডিসেম্বরের শুরুতে এক ঠান্ডা ও বৃষ্টিভেজা দিনে তিনি যাত্রার প্রস্তুতি নেন। চ্যানেল পার হওয়ার সময় অনেক মানুষের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি মানবপাচারকারীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাচারকারী বলেছিল, যারা মারা গেছে তারা নায়ক হতে চেয়েছিল।

সাহেল তখন মনে মনে ভাবেন, ‘যদি আমি মারা যাই, তাতেও সমস্যা নেই। অন্তত স্বাধীন হওয়ার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছি।’

কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপদ আসে নৌকাডুবি থেকে নয়। যে মানবপাচারকারী তার যাত্রার আয়োজন করছিল, তার সঙ্গে আরেক পাচারকারীর বিরোধ বাধে। একপর্যায়ে তারা অস্ত্র বের করে গুলি চালাতে শুরু করে।

সাহেল বলেন, তারা বুঝতেই পারেননি কেন তাদের হত্যা করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। সবাই প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালিয়ে লুকিয়ে পড়েন। তার দাবি, এত গুলির ঘটনা ঘটলেও পুলিশ সেখানে আসেনি। পরে একই রাতে তিনি আরও প্রায় ৬০ জনের সঙ্গে আরেকটি নৌকায় উঠতে সক্ষম হন। এবার কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই তারা যুক্তরাজ্যে পৌঁছে যান।

যুক্তরাজ্যে পৌঁছে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি তাকে অবাক করেছে, সেটি মানুষের আচরণ। সাহেল বলেন, ‘আমি অনেক দিন মানুষের মুখে হাসি দেখিনি। যুক্তরাজ্যে এসে প্রথমবার মানুষের হাসি দেখলাম। এখানে এসে মনে হয়েছে মানুষ আমাকে স্বাগত জানিয়েছে। এখানে মানবিকতা আছে, দয়া আছে। সবচেয়ে বড় কথা, আমি জানি এখানে আমাকে হত্যা করা হবে না। আমি নিরাপদ।’

চলতি বছরের শুরু থেকে তিনি আইনগতভাবে যুক্তরাজ্যে থাকার এবং কাজ খোঁজার অনুমতি পেয়েছেন। এখন নতুন জীবন শুরু করলেও জন্মভূমি ইয়েমেনকে ভুলতে পারেন না তিনি। সাহেলের ভাষায়, ইয়েমেন হলো ‘শয়তানের হাতে বন্দি স্বর্গ।’

তিনি বলেন, ‘আমি আমার দেশকে খুব মিস করি। কিন্তু সেখানে আমার সঙ্গে যা হয়েছে, সেগুলো আমি ঘৃণা করি। আমি চাই না কোনো অর্থ ছাড়াই রাস্তায় গুলিতে মারা যাই। আমি পৃথিবীতে বড় কিছু করতে চাই। একজন ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে চাই। এটাই এখন আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।’

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান