পার্বত্য চট্টগ্রামে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৫৭টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। সংগঠনটির দাবি, এসব ঘটনায় ১৫৪ জন জুম্ম জনগোষ্ঠীর সদস্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন এবং ১০ জন নিহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার (১ জুলাই) প্রকাশিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর অর্ধ-বার্ষিক (জানুয়ারি-জুন ২০২৬) প্রতিবেদন’-এ এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গামাটি আসন থেকে নির্বাচিত দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও একই দিনে চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়। জেএসএসের দাবি, এই নিয়োগ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মূল চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে প্রতিমন্ত্রীকে মন্ত্রণালয় থেকে অপসারণের দাবি জানানো হলেও সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দায়িত্ব গ্রহণের ১০২ দিনের মাথায় দীপেন দেওয়ানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং এরপর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কোনো জুম্ম প্রতিনিধিকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। জেএসএসের অভিযোগ, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি লঙ্ঘন করে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের মাধ্যমে মন্ত্রণালয় পরিচালিত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে ১১ মার্চ এক আলোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের দেওয়া বক্তব্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তিনি রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে শতভাগ মানবাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন। জেএসএসের মতে, এ ধরনের বক্তব্য মানবাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিবেশকে উৎসাহিত করতে পারে।
জেএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় সাড়ে চার মাস অতিক্রান্ত হলেও ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তাদের দাবি, রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে পূর্ববর্তী সরকারগুলোর ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও সামরিকীকরণকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে নিরাপত্তা বাহিনী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সেনা-মদদপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী, সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠী, মুসলিম বাঙালি সেটেলার এবং ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে মোট ৫৭টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৫৪ জন জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হন এবং ১০ জন নিহত হন।
এর মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ২৪টি ঘটনার অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৪৫ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাশাপাশি ২১টি গ্রামে টহল অভিযান পরিচালনা এবং নতুন করে ৩৪টি বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেনা-সৃষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করা ইউপিডিএফ (প্রসিত), মারমা লিবারেশন পার্টি ও কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)-এর বিরুদ্ধে ১২টি ঘটনার অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব ঘটনায় দুইজন নিহতসহ ২৭ জন মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মারধর, হত্যা, গুলিতে আহত, তল্লাশি, হত্যার হুমকি, টাকা ও মোবাইল ছিনতাই এবং চাঁদা দাবি।
প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, ইউপিডিএফ বিভিন্ন নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেএসএসের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অপপ্রচার চালাচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, চাকমা সাহিত্য একাডেমির পরিচালক, পুলিশ সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সুশীল সমাজের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মানহানিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। জেএসএসের ভাষ্য, এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিবাদ দেখা গেছে।
মুসলিম বাঙালি সেটেলার, ভূমিদস্যু ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ১০টি ঘটনার অভিযোগও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এসব ঘটনায় চারজন নিহত, ৪৩ জন আহতসহ মোট ৬৯ জন জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। একটি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় হামলার শিকার ১০ জন ম্রো গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে উল্টো মামলা দায়েরের অভিযোগও করা হয়েছে। এছাড়া বান্দরবানে অনুপ্রবেশকালে ২১ জন রোহিঙ্গাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আটক করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলায় বিশেষ করে ম্রো, ত্রিপুরা ও কিছু চাকমা জনগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে ধর্মান্তরকরণের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। জেএসএসের দাবি, শিক্ষা ও আর্থিক সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে শিশুদের ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানের মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে অভিভাবকদের অজান্তে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তর এবং তাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় ও পোশাক পরিবর্তনের ঘটনা ঘটছে।