সকাল সাড়ে ৮টা। অফিসে পৌঁছাতে প্রতিদিনের মতো বাসা থেকে বের হয়েছেন পশ্চিম মানিকদির বাসিন্দা মোহাম্মদ শাখিল। ইসিবি চত্বরের কাছাকাছি পৌঁছেই থেমে যায় তার যাত্রা। একের পর এক অটোরিকশা উল্টো পথে ঢুকছে, বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে, মোটরসাইকেল ফাঁক গলে এগোতে গিয়ে আরও বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। কয়েক মিনিটের পথ পাড়ি দিতে লেগে যায় প্রায় চল্লিশ মিনিট। এ দৃশ্য শুধু শাখিলের নয়, প্রতিদিন হাজারো কর্মজীবী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল ইসিবি চত্বর ও কালশী ব্রিজমুখী সড়কে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র যানজট ও অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অফিসগামী মানুষের চাপ এবং বিকাল ৪টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ফেরার সময় এলাকাটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
সরেজমিনে দেখা যায়, যানজটের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে উল্টো পথে যান চলাচল। বিশেষ করে গোলচত্বর দিয়ে দক্ষিণ ও পশ্চিম মানিকদি দিকে বিপরীতমুখীভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা প্রবেশ করছে। এছাড়া তুরাগ থানা ও বিমানবন্দরের পেছনের সড়ক ব্যবহার করে কচুক্ষেতগামী অসংখ্য ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য হালকা যানবাহন নিয়ম ভেঙে উল্টো পথে চলাচল করে। তাদের সাথে যুক্ত হয় মোটরসাইকেল ও গাড়ি। এছাড়া যাত্রীবাহী বাস। নির্ধারিত বাসস্টপ ব্যবহার না করে যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা করায় যানজট আরও তীব্র আকার ধারণ করছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, 'এখানে দিনের বেশির ভাগ সময়ই যানজট থাকে। বিশেষ করে অফিস সময়ে রাস্তা পুরোপুরি স্থবির হয়ে যায়। উল্টো পথে অটোরিকশা চলাচল বন্ধ না করলে এই সমস্যার সমাধান হবে না।'
দক্ষিণ মানিকদির বাসিন্দা মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, 'একটি অটোরিকশা উল্টো পথে ঢুকলে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি অটোরিকশা বের হতে পারে না। তখন দুই দিকের যানবাহন আটকে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো এলাকায় দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।'
পশ্চিম মানিকদির বাসিন্দা মোহাম্মদ শাখিল বলেন, 'অফিসে যেতে প্রতিদিন অতিরিক্ত সময় হাতে নিয়ে বের হতে হয়। কখনো কখনো যানজটের কারণে গুরুত্বপূর্ণ কাজও মিস হয়ে যায়।'
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের দুই পাশে হালকা যানবাহনের জন্য আলাদা লেন থাকলেও তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। কোথাও অবৈধ পার্কিং, কোথাও দোকানের মালামাল, আবার কোথাও দখলের কারণে সেই পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে মূল সড়কের ওপরই সব ধরনের যানবাহনের চাপ তৈরি হচ্ছে।
যানজট নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক সদস্যদেরও কথা হয় দেশ রূপান্তর প্রতিবেদকের সাথে। তারা বলেন, প্রতিদিন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। সারাদিন তীব্র রোদ, বৃষ্টি ও ধুলাবালির মধ্যে কাজ করেও উল্টো পথে চলাচলকারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হয় তাদের। অনেক সময় নিয়ম মানতে বললে চালকদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও হয়রানিরও শিকার হতে হয়। তারপরও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তারা।
এ সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক-গুলশান বিভাগ। বিভাগটির পক্ষ থেকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ইসিবি চত্বর থেকে কালশী ব্রিজমুখী সড়কের প্রায় ৫৫০ মিটার আগে একটি স্থায়ী ইউটার্ন নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ইউটার্ন নির্মাণ করা হলে ইসিবি চত্বরের ওপর চাপ কমবে এবং উল্টো পথে চলাচলের প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
নির্বাহী প্রকৌশলী নাঈম রায়হান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, 'ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে ইসিবি চত্বরে যানজট কমাতে একটি ইউটার্নের জন্য আবেদন করা হয়েছিল। সেই প্রেক্ষিতে গতকাল রাতেই আমরা সেখানকার মিডিয়ান ভেঙে একটি ইউটার্ন তৈরি করে দিয়েছি। বর্তমানে সাময়িকভাবে ট্রাফিক পুলিশ এটি ব্যবহার করছে। বৃষ্টির কারণে এখনই কার্পেটিং বা ব্ল্যাকটপের কাজ করা সম্ভব হয়নি, তবে বৃষ্টি কমলেই দ্রুতই এই ইউটার্নের কার্পেটিংয়ের কাজ সম্পন্ন করা হবে। এছাড়া যান চলাচল আরও সহজ করতে চত্বরের পাশের রিকশা বা এনএমটি লেনের প্রায় ৫০ ফিটের মতো জায়গা আজ রাতেই অপসারণ করা হবে, যার ফলে রাস্তাটি আরও প্রশস্ত হবে এবং এই এলাকার যানজট অনেকটাই কমে আসবে।'
স্থানীয়দের দাবি, শুধু ইউটার্ন নির্মাণ করলেই হবে না। পাশাপাশি উল্টো পথে যান চলাচল কঠোরভাবে বন্ধ, নির্ধারিত বাসস্টপ ছাড়া যাত্রী ওঠানামা নিষিদ্ধ করা, সড়কের দুই পাশের দখল উচ্ছেদ এবং হালকা যানবাহনের জন্য নির্ধারিত লেন কার্যকর করা জরুরি। অন্যথায় প্রতিদিনের এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলবে না।
ইসিবি চত্বর রাজধানীর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন পূর্বে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, পশ্চিমে মিরপুর ডিওএইচএস, উত্তরায় বিমানবন্দর, উত্তরা, দিয়াবাড়ি ও তুরাগ এবং দক্ষিণে মহাখালী, ফার্মগেট, কচুক্ষেত ও রাজধানীর বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করেন লাখো মানুষ। ফলে এই একটি মোড়ে দীর্ঘস্থায়ী যানজট সৃষ্টি হলে এর প্রভাব আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রস্তাবিত স্থায়ী ইউটার্ন নির্মাণ, উল্টো পথে যান চলাচল বন্ধ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে শুধু ইসিবি চত্বরই নয়, পুরো এলাকার যানজট অনেকটাই কমে আসবে।