শিক্ষকের হাত ধরে

পরপর জেলা শিরোপা। ২০২৫ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টের বালিকা বিভাগে যশোর জেলা চ্যাম্পিয়ন। বালক বিভাগে রানার্সআপ। ২০২৬ সালে বালক-বালিকা উভয় গ্রুপেই চাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে যশোরের ঝিকরগাছার বেনেয়ালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এরপর বিভাগীয় পর্যায়ে দাপট দেখিয়ে বালক বিভাগে রানার্সআপ ও বালিকা বিভাগে তৃতীয় স্থান অধিকার করে। অথচ এই সাফল্যের নেপথ্যে ছিল না কোনো পেশাদার কোচ, আধুনিক একাডেমি কিংবা বড় বাজেট। আছেন শুধু একজন শিক্ষককে এম আশরাফুল ইসলাম, যিনি বিশ^াস করেন, খেলাধুলা শুধু ট্রফি জেতায় না, শিশুদের বিদ্যালয়মুখীও করে।

২০১২ সালে যশোর জেলার ঝিকরগাছার মাইটকোমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদানের মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু। তিনি দেখেন পড়াশোনায় শিশুদের একদমই মন নেই। উপস্থিতির হারও নগণ্য। প্রথমেই তিনি উপলব্ধি করেন যেকোনো মূল্যে শিশুদের উপস্থিতি বাড়াতে হবে। কীভাবে বাড়ানো যায় সেই চিন্তা করতেই তিনি আবিষ্কার করেন পড়াশোনার চাপ নয় বরং খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের স্কুলমুখী করা সম্ভব।

ফুটবল নিয়ে মাঠে নেমে পড়লেন তিনি। প্রশিক্ষণের পর স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে নিয়মিত প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে লাগলেন। শিক্ষার্থীরাও পারদর্শিতা দেখাতে শুরু করল। সফলও হলেন আশরাফুল ইসলাম। ওই সময় স্থানীয় মানুষ তাকে সহযোগিতা করেছেন।

সেই থেকে শুরু। বাড়তে থাকে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি। পড়াশোনার পাশাপাশি এগিয়ে যায় খেলাধুলার মান। তবে প্রথম বছর পারেননি, দ্বিতীয় বছরও পারেননি, তাতে হাল ছাড়েননি। তৃতীয়বার সাফল্য ধরা দেয়। জেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে তিনি প্রমাণ করেন ইচ্ছাশক্তি থাকলে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া যায়।

খেলাধুলাবিষয়ক কোনো প্রশিক্ষণ নেই এই শিক্ষকের। তবে খেলাধুলা বিষয়ে নিজ ধারণা থেকেই তিনি শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। ২০১৯ সালে বেনেয়ালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে এ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ৩৫০ জন।

সরেজমিন দেখা যায়, বিশাল মাঠের এককোণে শিক্ষার্থীরা অনুশীলন করছে। মাঝেমধ্যে গলায় ঝোলানো বাঁশিতে ফুঁ দিচ্ছেন আশরাফুল আলম। এতেই শিক্ষার্থীরা খেলার ধরনসহ নানা দিক পরিবর্তন করছে। পাশাপাশি লাফ, দৌঁড়সহ নানা অনুশীলন করাচ্ছেন। তাকে সহযোগিতা করছেন এই স্কুলেরই প্রাক্তন দুই শিক্ষার্থী।

আশরাফুল আলম জানালেন, শুধুমাত্র খেলাধুলায় নয় শাপলা ক্যাব অ্যাওয়ার্ডের আমাদের স্কুল থেকে জাতীয় পর্যায়ে ১২ জন শিক্ষার্থী জাতীয় পর্যায়ে সুযোগ পেয়েছে। আমাদের এক শিক্ষার্থী সুরাইয়া আক্তার জুঁই সম্প্রতি বিকেএসপিতে অ্যাথলেটিকস বিভাগে সুযোগ পেয়েছে। বর্তমানে আনুশকা দাসের মতো ক্ষুদে খেলোয়াড়কে আমরা আবিষ্কার করতে পেরেছি।

প্রধান শিক্ষক আফসানা নাজনিন বলেন, আশরাফুল আলমের মতো একজন শিক্ষক থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য আশীর্বাদ। তার কর্মঠ কর্মকাণ্ডের কারণে আমাদের স্কুল আজ জেলা পর্যায়ে বারবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করছে।

ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাফফাত আরা সাঈদ বলেন, আমাদের কাছে বরাদ্দ না থাকায় বেনেয়ালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহযোগিতা করতে পারছি না। তবে মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দের বিষয়ে জানানো হবে। পাশাপাশি ওই প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদে খেলোয়াড়দের দ্রুত একটি সংবর্ধনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ টুর্নামেন্ট থেকে যেসব ভালো খেলোয়াড় আবিষ্কার হয়েছে তারা যেন ভবিষ্যতে ভালো পর্যায়ে খেলতে পারে সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন কাজ করবে।