২০২৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের জার্সিতে দ্বিতীয় সোনালি তারকা যোগ করার মিশন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পা রেখেছিলেন কোচ টমাস টুখেল। কিন্তু নকআউট পর্বের প্রথম ধাপেই যে এমন চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে, তা হয়তো ভাবেননি কোনো ইংলিশ সমর্থক। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ এবং শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড। ম্যাচের সিংহভাগ সময়জুড়ে মাঠের খেলায় বিপর্যয়ের সুবাস পাচ্ছিলের থ্রি-লায়ন্সরা, ভেসে উঠছিল ২০১৬ সালের ইউরোতে আইসল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার সেই ভয়ংকর স্মৃতি। তবে সব শঙ্কা উড়িয়ে শেষ ১৫ মিনিটে দৃশ্যপটে হাজির হলেন অধিনায়ক হ্যারি কেইন। তার জাদুকরী জোড়া গোলে ডিআর কঙ্গোকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ১৬ (রাউন্ড অব সিক্সটিন) নিশ্চিত করেছে ইংল্যান্ড।
ম্যাচের শুরুতেই থমকে যায় টুখেলের রণপরিকল্পনা। মাত্র ৭ মিনিটের মাথায় ব্রায়ান সিপেঙ্গার দুর্দান্ত গোলে লিড নেয় ডিআর কঙ্গো। যুদ্ধবিধ্বস্ত নিজ দেশকে ফুটবল মাঠে এক সুতোয় গাঁথার রোমাঞ্চ নিয়ে আসা আফ্রিকান এ দলটি প্রথমার্ধেই জানান দেয়, তারা আজ ইতিহাস গড়তেই মাঠে নেমেছে। আফ্রিকার কোনো দলের বিপক্ষে এর আগে ইংল্যান্ডের পরাজয়ের রেকর্ড ছিল মাত্র একটি (গত বছরের জুনে সেনেগালের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে)। ফলে ম্যাচটিতে এক চরম অঘটনের গন্ধ পাচ্ছিলেন ফুটবলপ্রেমীরা।
১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে আক্রমণের ধার বাড়ালেও ইংল্যান্ডের সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কঙ্গোর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি। যেন লিওনেল মেসি নন, ফুটবলবিশ্ব দেখছিল লিওনেল এমপাসির অবিশ্বাস্য এক প্রদর্শনী। ম্যাচের পুরোটা সময় জীবনের সেরা ম্যাচটি খেলেছেন তিনি। বুকায়ো সাকা, মার্কাস র্যাশফোর্ডদের একের পর এক নিশ্চিত গোল করা থেকে বঞ্চিত করেন এ গোলরক্ষক। ইংল্যান্ড যেমন সুযোগ হাতছাড়া করছিল, ঠিক তেমনি তাদের নড়বড়ে রক্ষণভাগও বারবার কঙ্গোর কাউন্টার অ্যাটাকের সামনে খেই হারিয়ে ফেলছিল।
টুখেলের চাল ও হ্যারির সমতা : দ্বিতীয়ার্ধে পরিস্থিতি বদলে দিতে মরিয়া টুখেল মাঠে নামান উইঙ্গার অ্যান্থনি গর্ডনকে। এই পরিবর্তনই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ৭৫ মিনিটে বাম প্রান্ত থেকে গর্ডনের নিখুঁত এবং লুপানো চিপ খুঁজে নেয় ডি-বক্সে থাকা হ্যারি কেইনকে। মাত্র ছয় গজ দূর থেকে নিখুঁত এক হেডে বল কঙ্গোর জালে জড়ান ইংলিশ অধিনায়ক। গোলরক্ষক এমপাসি হাত ছোঁয়ালেও বলের গতি রোধ করতে পারেননি। ১-১ সমতায় প্রাণ ফিরে পায় স্তব্ধ হয়ে যাওয়া ইংলিশ গ্যালারি।
ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে গড়াচ্ছিল, তখনই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ৮৬ মিনিটে কঙ্গোর ডি-বক্সের প্রান্তে বল পান কেইন, তখন গোলপোস্টের দিকে তার পিঠ ফিরোনো ছিল। অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ডিফেন্ডারদের এড়িয়ে ডানদিকে ড্রিবল করে ঘুরে দাঁড়ান এবং শরীরটা বাঁকিয়ে এক অবিশ্বাস্য বুলেট গতির শট নেন। প্রায় ৯৪ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা বেগের সেই উগ্র, অপ্রতিরোধ্য শটটি কঙ্গোর গোলরক্ষককে পরাস্ত করে টপ-রাইট কর্নার দিয়ে জালে আছড়ে পড়ে।
এটি ছিল বিশ্বকাপে হ্যারি কেইনের ১৩তম গোল। এই গোলের মাধ্যমে তিনি ফুটবল সম্রাট পেলেকে (১২ গোল) ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের সর্বকালীন সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় এক ধাপ ওপরে উঠে গেলেন।
টুর্নামেন্টে গোল সংখ্যা পাঁচে উন্নীত করা কেইন ম্যাচশেষে বলেন, কী অবিশ্বাস্য একটা ম্যাচ ছিল! প্রথমার্ধে ওদের গোলরক্ষক কিছু অবিশ্বাস্য সেভ করেছে। তবে আক্রমণভাগের দিক থেকে বললে, টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত সম্ভবত এটাই আমাদের সেরা ম্যাচ ছিল। আমরা টুর্নামেন্টের এমন একটা পর্যায়ে আছি, যেখানে যেকোনো মূল্যে জয় ছিনিয়ে আনাটাই আসল, আর আজ আমরা সেটাই করেছি।’
শেষ ১৬-তে মেক্সিকোর সঙ্গে খেলবে ইংল্যান্ড। সেই ম্যাচ জিতলে কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের সামনে পড়তে হতে পারে তাদের।