রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী মহিলা ডিগ্রি কলেজের (বর্তমানে শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ) সাবেক ও বর্তমান অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষককে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষক দেখিয়ে এমপিওভুক্ত করা, বিধিবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত বাড়িভাড়া গ্রহণ, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করেও সম্মানী গ্রহণ ও বিদেশে অবস্থানকালে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করা।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এসব অভিযোগের তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালককে চিঠি দিয়েছে। পরে মাউশির দুটি পৃথক তদন্ত কমিটিও অভিযোগগুলোর অনুসন্ধান করে। তদন্তে বেশ কয়েকটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে কলেজের একজন শিক্ষক প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে মাউশিতে ও দুদকে লিখিত অভিযোগ করেন। তাতে এক ডজনের বেশি অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরা হয়। দুদক বিষয়টির তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মাউশিকে চিঠি দেয়। এরপর মাউশির উপপরিচালক (শারীরিক শিক্ষা) ড. মুহাম্মদ মনিরুল হক এবং অফিসার ইনচার্জ (কমার্শিয়াল সেল) মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমানকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ ছাড়া মাউশিতে দাখিল করা অভিযোগের তদন্তে সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক রাকিবুল হাসান ও আসমা আক্তারের সমন্বয়ে আরেকটি তদন্ত কমিটি করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, কলেজের উপাধ্যক্ষ মো. আলমগীর হোসেনের স্ত্রী আয়শা আক্তার ২০০৪ সালের ১৮ জানুয়ারি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান। কিন্তু অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের যোগসাজশে গভর্নিং বডিকে অবহিত না করেই তাকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনস্ত শিক্ষক দেখিয়ে এমপিওভুক্ত করা হয় এবং ১৪ মাস বেতন-ভাতা দেওয়া হয়। বেতন-ভাতা সংক্রান্ত নথিতে অন্য শিক্ষকদের নাম টাইপ করা থাকলেও আয়শা আক্তারের নাম পরে হাতে লিখে সংযোজন করা হতো। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জোবায়দা ছামিহা খাতুন গভর্নিং বডিকে জানান যে, ঘটনাটি ভুলবশত ঘটেছিল।
২০০৫ সালের ২ জুলাই আয়শা আক্তার পদত্যাগ করেন। এ ঘটনায় বিচার চেয়ে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন কলেজের সাবেক সহকারী অধ্যাপক মো. গোলাম মোরশেদ। মামলায় বর্তমান অধ্যক্ষ মো. আলমগীর হোসেন, তার স্ত্রী ও ন্যাশনাল একাডেমি ফর এডুকেশনাল ম্যানেজমেন্টের (নায়েম) উপপরিচালক আয়শা আক্তার এবং গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জোবায়দা ছামিহা খাতুনকে আসামি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কলেজে অডিট কমিটি না থাকায় অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নিজেদের ইচ্ছামতো বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ করেন। বিধি অনুযায়ী ১০ শতাংশ বাড়িভাড়া পাওয়ার কথা থাকলেও তার চেয়ে অনেক বেশি হারে ভাতা নিয়েছেন তারা।
এ ছাড়া পাঠদান না করেও সম্মানী গ্রহণ এবং অনুমতি ছাড়াই বিদেশ সফর করেছেন।
জানা গেছে, মাউশির দুটি তদন্ত কমিটি অনুসন্ধান শেষে যথাক্রমে ২০২৩ সালের ১৫ জুন এবং ২০২৫ সালের ১৭ জুন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক অধ্যক্ষ নিলুফা আক্তারের উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ বিধিসম্মত ছিল না। উনাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন তৎকালীন কলেজ সভাপতি মনির হোসেন, যিনি পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে সনদপত্র উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হন। তিনি ২০১১ সালে উপাধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে একাধিক লোকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে কলেজের শিক্ষক জেবুন্নাহারও ছিলেন। জেবুন্নাহার উপাধ্যক্ষের পদ না পেয়ে মামলা করে সেই টাকা আদায় করেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাউশির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিলুফা আক্তার উপাধ্যক্ষ থাকাকালে বিধি অনুযায়ী ১০ শতাংশ বাড়িভাড়া নিলেও অধ্যক্ষ হওয়ার পর তিনি নিজের জন্য ১০০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া নেন। তিনি বাড়িভাড়া বাবদ অতিরিক্ত ৩৩ লাখ ৩১ হাজার ৭০৬ টাকা নিয়েছেন; অনার্স শ্রেণিতে পাঠদান না করেও সম্মানী বাবদ আরও ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা নিয়েছেন। তিনি মোট ৩৭ লাখ ৩৯ হাজার ৭০৬ টাকা অতিরিক্ত নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিলুফা আক্তার একাধিকবার অনুমোদন ছাড়াই ভারত ও দুবাই সফর করেন। বিদেশ থেকে দেশে ফিরে তিনি হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে বিদেশে থাকাকালে কলেজে উপস্থিত থাকার প্রমাণ দেখানোর চেষ্টা করেন। এ ধরনের কর্মকা- অসদাচরণ ও জনবল কাঠামোর বিধানের পরিপন্থি।
প্রতিবেদনে বর্তমান অধ্যক্ষ মো. আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি মূল বেতনের ১০ শতাংশ বাড়িভাড়া পাওয়ার যোগ্য হলেও ৪৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া নিয়েছেন। এতে কলেজের তহবিল থেকে অতিরিক্ত ১৩ লাখ ৬১ হাজার ৭৮০ টাকা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া পাঠদানের নামে আরও ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা সম্মানী নেওয়া হয়েছে। তিনি মোট ১৬ লাখ ৮১ হাজার ৭৮০ টাকা অতিরিক্ত গ্রহণ করেছেন, যা কলেজ তহবিলে ফেরতযোগ্য বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহকারী অধ্যাপক জোবায়দা ছামিহা খাতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে থোক বরাদ্দ থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মাসে ২৫ হাজার টাকা করে মোট ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত গ্রহণ করেছেন। বিধিবহির্ভূতভাবে এ অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে, যা কলেজ তহবিলে ফেরত আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক অধ্যক্ষ বেগম নিলুফা আক্তার বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। কলেজ থেকে আমি যে অর্থ নিয়েছি, তার সব কাগজপত্র রয়েছে। তদন্ত কমিটি আমার সঙ্গে কোনো কথা বলেনি, কোনো নোটিসও দেয়নি। তারা কী প্রতিবেদন দিয়েছে, সে বিষয়েও আমি অবগত নই।’
বর্তমান অধ্যক্ষ মো. আলমগীর হোসেনের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।