সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের তাগিদ

নিরাপদ, উন্মুক্ত ও পারস্পরিক সংহতির সমাজ নির্মাণের জন্য সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সমাজ ও রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে গতকাল বুধবার এক স্মরণ অনুষ্ঠানে। রাজধানীর গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার দশম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ তাগিদ দেওয়া হয়। 

ইতালির রাষ্ট্রদূত অ্যান্তোনিও আলেসান্দ্রো উক্ত হামলা উপলক্ষে নিজের বাসভবনে একটি স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। হামলার ১০ বছরপূর্তি উপলক্ষে ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেল্লার একটি বক্তব্য থেকে রাষ্ট্রদূত উদ্ধৃতি দেন। প্রেসিডেন্ট মাত্তারেল্লা বলেন, সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘৃণা ও বিভাজন ছড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু তা না হয়ে মানুষের মধ্যে সংহতির বোধ আরও শক্তিশালী হয়েছে। মানুষ নিজেদের মধ্যে সংলাপের মূল্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে যৌথ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। তিনি বলেন, সভ্যতার মূলনীতি রক্ষার জন্য সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান দরকার, যাতে নিরাপদ, উন্মুক্ত ও পারস্পরিক সংহতির ভিত্তিতে সমাজ নির্মাণ করা যায়।

রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো বলেন, সেদিনের ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের অধিকাংশই বিভিন্ন পটভূমি থেকে আসা তরুণ ও মেধাবী  ছিলেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা বড় স্বপ্ন দেখতেন। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মাধ্যমে বাংলাদেশে উন্নত সমাজ গঠনে তরুণদের ভূমিকাও স্মরণ করা হয়।

হামলার সময় সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, অন্যের নিরাপত্তা ও দেশের সুরক্ষার প্রশ্নে দায়িত্ববোধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা তারা (পুলিশ) স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

রাষ্ট্রদূত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ইতালির অবস্থান নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলায় হামলায় ইতালির ৯ নাগরিকসহ ২৪ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে দুজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। হামলার পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ছয় হামলাকারীও নিহত হয়।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ওই হামলার ঘটনা জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সংহতি ও অভিন্ন মূল্যবোধ রক্ষায় সম্মিলিত সতর্কতার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছে। 

রাজনৈতিক, ধর্মীয়, আদর্শিক বা অন্য কোনো কারণেই সন্ত্রাসবাদকে কখনো ন্যায্যতা দেওয়া যায় না, এমনটি উল্লেখ করে তিনি বলেন,  সন্ত্রাসী শক্তির বাংলাদেশে কোনো স্থান নেই। দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে, তাদের কখনোই সুযোগ দেওয়া হবে না।

বাংলাদেশে কূটনৈতিক কোরের ডিন ও ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ রমাদান, জাপানের রাষ্ট্রদূত শিনইচি সাইদা, ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত উপপ্রধান আলবার্ট সিয়া, হামলায় নিহত ফারাজ আইয়াজ হোসেনের মা ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান ও বড় ভাই যারেফ আয়াত হোসেনসহ অন্যরা ইতালির রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন। হামলায় যারা নিহত হয়েছিলেন, তাদের নাম অনুষ্ঠানে উল্লেখ করা হয় এবং উপস্থিত বিশিষ্টজনরা নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। সবাই নিহতদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করেন। 

বিচারের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষা : গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারি রেস্তোরাঁয় নৃশংস হত্যার ঘটনায় ১০ বছরেও চূড়ান্ত বিচার নিষ্পত্তি হয়নি। মামলাটি অধস্তন আদালত, হাইকোর্ট হয়ে এখন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। যদিও অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এরই মধ্যে গণমাধ্যমকে বলেছেন এ মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় রাষ্ট্রপক্ষ শুনানির উদ্যোগ নেবে।

আলোচিত এ মামলায় অধস্তন আদালতের রায় হয় ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর। এদিন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে নব্য জেএমবির সাত সদস্যকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়। দন্ডাদেশ পাওয়া আসামিরা হলেন রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন এবং শরিফুল ইসলাম খালেদ। এ রায়ের পর আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদনের নথি) পাঠানো হয় হাইকোর্টে।

অধস্তন আদালতের রায়ের চার বছর পর আসে হাইকোর্টের রায়। আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, নিয়মিত আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর সাত আসামির মৃত্যুদ- কমিয়ে তাদের আমৃত্যু কারাদন্ড দেয়। পাশাপাশি প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদন্ড অনাদায়ে আরও ৫ বছর করে কারাদন্ড দেওয়া হয়। গত বছরের জুনে ২২৯ পৃষ্টার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।

সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে আসলাম হোসেন ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে পালানোর সময় কারারক্ষীদের গুলিতে নিহত হন। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আমৃত্যু কারাদন্ডপ্রাপ্ত জীবিত ছয় আসামি আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন। এ আপিলগুলো শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।