সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার দুই ইউনিয়নের ৬টি গ্রামে যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। গ্রামগুলো হলো, উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর, ধীতপুর, কুরসি, বারপাখিয়া, গালা ইউনিয়নের মোহনপুর ও বৃ-হাতকোড়া গ্রাম। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ভাঙনের তা-বে ৬ গ্রামের বেশিরভাগ ফসলিজমি, বাড়িঘর, মসজিদ-মাদ্রাসা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট যেটুকু রয়েছে, তাও বিলীন হওয়ার পথে। গত এক মাস আগেও যেখানে বাড়িঘর ছিল, এখন সেখানে অথৈ পানি।
এ বিষয়ে ধীতপুর গ্রামের শতবর্ষী রহিতন বেগম বলেন, ‘জন্মের পর ছোটবেলা থেকেই বাবার বাড়িতে কষ্ট করেছি। আবার বিয়ের পর স্বামী গরিব হওয়ায় সেখানেও কষ্ট করেছি। এ জীবনে সুখ কি জিনিস তা পেলাম না। এখন এই বয়সে এসে যমুনা নদীর ভাঙনে বাড়িঘর হারিয়ে অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে কষ্ট করছি।’ তিনি বলেন, যমুনা নদীতে সবকিছু হারিয়ে তিনি এখন নিঃস্ব। তার থাকার মতো একটি ঘরও নেই। একটি জীর্ণ ছাপড়াঘরে স্বামীহারা এক মেয়েকে নিয়ে থাকেন। জমির আইল থেকে শাকপাতা তুলে অথবা বড়শি দিয়ে নদী থেকে মাছ ধরে বাজারে বিক্রির পর যে আয় হয়, তা দিয়ে তাদের মা-মেয়ের জীবন-জীবিকা চলে।
ধীতপুর মসজিদের ইমাম আব্দুল আলীম বলেন, ‘এই চরে প্রচুর পরিমানে পটোল, বেগুন, ধান, বাদাম, মাষকলাই, সরিষা, ইরি-বোরো ধানসহ সব ধরনের ফসল চাষ হয়। ফসল চাষ করে এ চরের মানুষ ভালোভাবেই জীবনযাপন করছিল। এখন প্রায় সবারই বাড়িঘর ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে তারা এখন সর্বস্ব হারিয়ে অন্যের জমিতে ঘর তুলে থাকে। আবারও তারা ভাঙনের কবলে পড়ায় চরম দুর্বিপাকে পড়েছেন। তারা এখন কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবেন, কি খাবেন তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।’
একই গ্রামের শামছুল হক জানান, এ পর্যন্ত সাত বার তার বাড়িঘর ও ফসলি জমি যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আবারও তিনি ভাঙনের কবলে পড়েছেন। এখন তার রাত কাটে ভাঙণ আতঙ্কে।
এ বিষয়ে স্থানীয় নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সোনাতনীর বালুমাটি সোনার মতোই ছিল। এই বালু মাটিতে যা বুনেছি, তাই ভালো জন্মেছে। শাকসবজি বুনে আমাদের সংসার ভালোই চলছিল। এখন ভাঙনের কবলে পড়ে সবকিছু নদীতে চলে যাচ্ছে। ফলে আমরা সবকিছু হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছি। এখন আমরা কোথায় যাব, কি খাবÑতা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছি।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহজাহান আলী বলেন, ‘ভাঙতে ভাঙতে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। ভাঙনরোধে কোনো সরকারই ব্যবস্থা নেয়নি। বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় এমপির কাছে আমরা ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নিতে দরখাস্ত দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা তো এখন নাই। বর্তমান সরকার যদি ব্যবস্থা নেয়, তাহলে আমরা বাঁচব। তা না হলে এভাবেই আস্তে আস্তে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।’
সোনাতনী ইউনিয়নের কুরসি গ্রামের ইয়াসিন মোল্লা বলেন, ‘আমাদের প্রায় ৬০ বিঘা জমি যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এরমধ্যে আমার নিজের জমিই বেশি ছিল। আমি প্রায় ৬ বিঘা জমিতে সবজি আবাদ করতাম। সব শেষ হয়ে গেছে। এখন থাকার একটু বাড়ি আছে, তাও যেকোনো মুহূর্তে নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।’ তিনি সরকারের কাছে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে দ্রুত ভাঙনরোধের জোর দাবি জানান।
সরকারের কাছে ভাঙনরোধে পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়ে ধীতপুর ঘোনাপাড়া গ্রামের হাফেজ উদ্দিন বলেন, ‘যমুনা নদীর ভাঙনে কুরসি-ধীতপুর গরুর হাট, মসজিদ-মাদ্রাসা, বাড়িঘর, ফসলি জমি সবকিছু বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভাঙন ঠেকাতে না পারলে মানুষ অসহায় হয়ে পড়বে। ভাঙনরোধে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে একসময় এ ইউনিয়নটিই সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাবে।’
শাহজাদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘গত বছরে এই ২টি ইউনিয়নের ৬টি গ্রামের অন্তত ২৫০ হেক্টর ফসলিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর বিপরীতে ৯০ হেক্টরের বেশি জমি জেগে উঠেছে। ফলে এ ইউনিয়নে জমির পরিমাণ তেমন একটা কমেনি। তবে যেসব ফসলি জমি নতুন করে ভেঙে যাচ্ছে, সেসব জমির মালিক তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা হলেও ক্ষতির মধ্যে পড়েছেন। তাই ভাঙনরোধে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে।’
এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা সারমিন ও সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তারা জানান, খোঁজ-খবর নিয়ে এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কথা বলবেন।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, চর রক্ষায় তাদের কোনো প্রকল্প নেই। তাই এখানকার ভাঙনরোধে তিনি আপাতত কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবেন না।