বাংলাদেশের ঔষধশিল্প দীর্ঘদিন ধরেই মানসম্পন্ন ও সাশ্রয়ী ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা দেখিয়ে আসছে। তবে উন্নত বিশ্বের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বাজারে বড় পরিসরে প্রবেশ করা এখনো এই খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সেই প্রেক্ষাপটে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান স্যান্ডোজের সঙ্গে অংশীদারত্বে কানাডায় ওষুধ রপ্তানি শুরু করেছে নেভিয়ান লাইফসায়েন্স। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুসাওয়াত শামস জাহেদীর মতে, এটি শুধু একটি রপ্তানি সাফল্য নয়; বরং বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের জন্য নতুন ধরনের একটি রপ্তানি মডেলের উদাহরণ।
এ অর্জন, এর তাৎপর্য এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে মুসাওয়াত শামস জাহেদী বলেন, এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্জন। কারণ কানাডা ওষুধ আমদানির ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বাজারগুলোর একটি। সেখানে ওষুধ রপ্তানি করতে হলে আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন সক্ষমতা, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থার জায়গা তৈরি করতে হয়।
তবে এই অর্জনের সবচেয়ে বড় দিক হলো এর রপ্তানি মডেল। আমরা শুধু নিজেদের ব্র্যান্ড নিয়ে কোনো বাজারে প্রবেশ করিনি; বরং একটি বহুজাতিক অংশীদারত্বের আওতায় বাংলাদেশে উৎপাদিত ওষুধ কানাডায় রপ্তানি করছি। স্যান্ডোজ এজি সুইজারল্যান্ডের ক্রয়াদেশের ভিত্তিতে নেভিয়ানের নিজস্ব প্ল্যান্টে ওষুধ উৎপাদন হচ্ছে এবং তা স্যান্ডোজ কানাডা ইনকরপোরেটেড আমদানি করছে। বাংলাদেশের ফার্মা খাতের জন্য উত্তর আমেরিকার বাজারে এমন অংশীদারত্বভিত্তিক রপ্তানি একটি নতুন দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানির জন্য এটি একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি মনে করি, এই অর্জনের মধ্যে সেই সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে যে আমরা সাশ্রয়ী দামে মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদন করতে পারি। তবে আমাদের রপ্তানি এখনো অনেকাংশে সেমি-রেগুলেটেড বা উন্নয়নশীল বাজারকেন্দ্রিক।
ফার্মাসিউটিক্যাল খাতকে সত্যিকার অর্থে পরবর্তী ধাপে নিতে হলে উন্নত বিশ্বের হাইলি-রেগুলেটেড বাজারে প্রবেশ করতে হবে। সে জন্য প্রচলিত রপ্তানি পদ্ধতির বাইরে গিয়ে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন, আন্তর্জাতিক মান ব্যবস্থাপনা এবং বহুজাতিক অংশীদারত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে। নেভিয়ানের কানাডা রপ্তানি সেই পথের একটি বাস্তব উদাহরণ।
ওষুধ রপ্তানিতে নেভিয়ানের নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন, মুসাওয়াত শামস জাহেদী। তার মতে, সাধারণত বাংলদেশের ফার্মা কোম্পানিগুলো নিজেদের ব্র্যান্ড নিয়ে বিভিন্ন দেশে স্থানীয় ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে বাজার তৈরির চেষ্টা করে। কিন্তু উন্নত বাজারে ব্র্যান্ড বিল্ডিং, মার্কেট ডেভেলপমেন্ট এবং শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক তৈরি করা সহজ নয়। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পার্টনারদের সক্ষমতাও সীমিত থাকে। ফলে রপ্তানি গন্তব্য ও আয় দুটোই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
অন্যদিকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নিজস্ব বাজার উপস্থিতি, ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এবং ব্র্যান্ড সক্ষমতা আছে। তাদের হয়ে যদি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মানে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন করতে পারে, তাহলে অনেক বড় বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়। কানাডায় নেভিয়ানের রপ্তানি সেই মডেলের ওপর ভিত্তি করেই হয়েছে। ভবিষ্যতে এশিয়া, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার উন্নত বাজারেও এই মডেল সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, নেভিয়ান নামটি নতুন হলেও এর পেছনে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সুইস মান-সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা আছে। ১৯৭৩ সালে সিবা-গেইগি বাংলাদেশ নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে স্যান্ডোজের সঙ্গে বৈশ্বিক একীভূতকরণের পর এটি নোভার্টিস বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত হয়। ২০২৫ সালে সিংহভাগ শেয়ার হস্তান্তরের পর কোম্পানির নতুন নাম হয় নেভিয়ান।
নাম পরিবর্তন হলেও মান, প্রক্রিয়া ও উৎপাদন দর্শনে কোনো পরিবর্তন হয়নি। আমরা এখনো নোভার্টিসের বিশ্বমানের ওষুধগুলো লাইসেন্সি হিসেবে একই ব্র্যান্ড, একই উপাদান, একই প্রক্রিয়া এবং একই মানে উৎপাদন করছি। আমাদের উৎপাদন প্ল্যান্ট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন জিএমপি এবং অ্যানভিসা সনদপ্রাপ্ত। মান নিয়ন্ত্রণে কোনো ছাড় না দেওয়ার এই সংস্কৃতিই আমাদের স্যান্ডোজের গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের অংশ হতে সহায়তা করেছে।
ওষুধ রপ্তানিতে আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা কোনো এককালীন কাজ নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেই হবে না প্রয়োজন সঠিক কালচার, শক্তিশালী সিস্টেম এবং দক্ষ জনবল। গ্লোবাল মার্কেটে আস্থা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু সেই আস্থা ধরে রাখা আরও কঠিন। কোয়ালিটি, ডেটা ইন্টেগ্রিটি, কমপ্লায়েন্স ও ডকুমেন্টেশনের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত আরও কঠোর মানদ- পূরণ করতে হয়। এ জন্য প্রযুক্তি, প্রক্রিয়া এবং মানবসম্পদে নিয়মিত বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এই খাতে বিনিয়োগের ফল দ্রুত আসে না, বিশেষ করে রপ্তানির ক্ষেত্রে। তাই দেশের বাজারেও ভালো উৎপাদকদের টেকসই ব্যবসার সুযোগ থাকা জরুরি। মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে যৌক্তিকভাবে ওষুধের দাম সমন্বয় করা গেলে কোম্পানিগুলো কোয়ালিটি সিস্টেম আধুনিকায়নে আরও বিনিয়োগ করতে পারবে। এতে শুধু রপ্তানি বাড়বে না, দেশের রোগীরাও উন্নত মানের ওষুধ পাবেন।
তার মতে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কি ওষুধ উৎপাদনের একটি আন্তর্জাতিক হাব হতে পারে। এ প্রসঙ্গে মুসাওয়াত শামস জাহেদী বলেন, আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা অত্যন্ত শক্তিশালী। আমাদের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প এখন একটি পরিণত অবস্থায় পৌঁছেছে। এখানে দক্ষ মানবসম্পদ আছে, উৎপাদন ব্যয় প্রতিযোগিতামূলক এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও বাড়ছে।
তবে এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত উন্নত বিশ্বের উচ্চ-নিয়ন্ত্রিত বাজারের জন্য বাংলাদেশকে একটি বিশ্বস্ত ম্যানুফ্যাকচারিং পার্টনার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। এর জন্য রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স আরও শক্তিশালী করতে হবে, আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত উৎপাদন কারখানার সংখ্যা বাড়াতে হবে, বায়োলজিক্সসহ জটিল ওষুধ তৈরির সক্ষমতায় বিনিয়োগ করতে হবে এবং বহুজাতিক অংশীদারত্ব বাড়াতে হবে।
শিল্প খাত ও নীতিনির্ধারকরা যদি সমন্বিতভাবে কাজ করেন, তাহলে ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প আগামী দিনে বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পর্কে তিনি বলেন, আমার বার্তা খুব পরিষ্কার, বাংলাদেশ এখন শুধু সম্ভাবনার গল্প নয়, সক্ষমতারও বাস্তব উদাহরণ। আমরা আন্তর্জাতিক মানে উৎপাদন করতে পারি, কঠোর নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণ করতে পারি এবং দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে পারি।
আমি মনে করি, ভবিষ্যতে আরও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশকে শুধু একটি বাজার হিসেবে নয়, বরং কৌশলগত উৎপাদন ও সাপ্লাই হাব হিসেবেও বিবেচনা করবে।