বিদায়ী অর্থবছরে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৭.৩ শতাংশ

বছরজুড়েই রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে ছিল ইতিবাচক ধারা। এই ধারবাহিকতায় বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৩ হাজার ৩২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসীদের পাঠানো আয় বেড়েছে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। গতকাল বুধবার প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।

চলতি বছরের হিসেবে রেমিট্যান্সের প্রবাহে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলে গত জুন মাসে সামান্য নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। গত জুনে রেমিট্যান্স এসেছে ২৮০ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে আসা ২৮২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের তুলনায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কম।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন জানান, ৩০ জুন এক দিনেই দেশে ১২ কোটি মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। তবে এটি প্রাথমিক হিসাব। ব্যাংক হলিডে থাকায় ১১টি ব্যাংকের তথ্য এতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে চূড়ান্ত হিসাবে এ দিনের রেমিট্যান্সের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

এদিকে সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে মাসভিত্তিক রেমিট্যান্সের চিত্রে দেখা যায়, গত জুলাইয়ে এসেছে ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার, আগস্টে ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, অক্টোবরে ২৫৬ কোটি ২৪ লাখ ডলার, নভেম্বরে ২৮৮ কোটি ৯৭ লাখ ডলার, ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ৩৬ লাখ ডলার, জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি ১৬ লাখ ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ৩০২ কোটি ডলার, মার্চে ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ডলার, এপ্রিলে ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার, মে মাসে ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং জুনে ২৮০ কোটি ৬ লাখ ডলার।

জানা গেছে, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধির ইতিবাচক ধারার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট (গ্রস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে নিট ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ রয়েছে ৩২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার।

প্রবাসী আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আমেরিকার দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচটি দেশ। এই তালিকায় রয়েছে সৌদি আরব, ইউএই, ওমান, কুয়েত ও কাতার। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরও বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তালিকার শীর্ষে থাকা যুক্তরাজ্য থেকে গত জুনে ৬৪৩ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন ডলার দেশে এসেছে, যা একক দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারভিত্তিক দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব থেকে ৫৪৬ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন ডলার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৪৬৮ দশমিক ১৬ মিলিয়ন ডলার এসেছে।

এ ছাড়া মালয়েশিয়া থেকে ৩০০ দশমিক ১৬ মিলিয়ন ডলার, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৬১ দশমিক ৪০ মিলিয়ন ডলার এবং ওমান থেকে ২০৯ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। ইউরোপের দেশ ইতালি থেকে ১৬৭ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার, মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত থেকে ১৬৬ দশমিক ২৬ মিলিয়ন ডলার, সিঙ্গাপুর থেকে ১৪১ দশমিক ০৬ মিলিয়ন ডলার এবং কাতার থেকে ১২৬ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

অর্থনীতিবিদ ড. মাসরুর রিয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, রেমিট্যান্সের এই প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে শুধু রেমিট্যান্স বাড়লেই হবে না, এই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে হুন্ডির পথ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে, যাতে এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকে।

সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডলারের বিনিময় হার তুলনামূলক বাস্তবসম্মত হওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর ওপর আরও জোর দিতে হবে। দক্ষ কর্মীরা বেশি আয় করেন, ফলে তারা বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন।

বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ইতিবাচক ধারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে, ডলারের বাজারে চাপ কমাতে এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।