নির্মাণকাজে নিয়োগের নামে রুশ সেনাবাহিনীতে বিক্রি: পরিবারে আহাজারি

ভালো বেতনে রাশিয়ায় কোম্পানির চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দালালের মাধ্যমে পাচার করা হয়েছিল রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার বাসিন্দা আলী হাসান সোহেলকে (৪২)। কিন্তু স্বপ্নের দেশে পা রাখার পরপরই তিনি সম্মুখীন হন এক নির্মম বাস্তবতার।

নির্মাণকাজের চুক্তিতে বিদেশে গেলেও সেখানে তাকে এবং আরও কয়েকজন বাংলাদেশিকে জোরপূর্বক রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে ড্রোন হামলায় আহত অবস্থায় রাশিয়ার একটি মেডিকেল ক্যাম্পে আছেন।

সোহেল গোয়ালন্দ পৌরসভার জুড়ান মোল্লার পাড়া এলাকার আব্দুল হকের ছেলে। পাঁচ ভাই-বোনের সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একটি দালাল চক্র কোম্পানির চাকরির কথা বলে সোহেলসহ চারজনের কাছ থেকে জনপ্রতি ৭ লাখ টাকা করে মোট ২৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া ও বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স সম্পন্ন করে গত ৭ মে তাদের রাশিয়ায় পাঠানো হয়।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, রাশিয়ায় পৌঁছানোর মাত্র তিন দিনের মাথায় সোহেলসহ অন্তত ৩০ জন বাংলাদেশিকে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে ওই প্রতারক চক্র। সেখানে তাদের চুল কেটে সামরিক পোশাক পরিয়ে দেওয়া হয় এবং বাধ্যতামূলক অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ শেষে পাঠানো হয় ইউক্রেন সীমান্তবর্তী ফ্রন্টলাইনে।

পরিবারের দাবি, প্রত্যেককে প্রায় ৩০ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বিনিময়ে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘ দেড় মাস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর সম্প্রতি ভিডিও কলে স্ত্রী আকলিমা খাতুনের সঙ্গে কথা বলেন সোহেল। ভিডিও কলে তাকে আহত ও বিপর্যস্ত অবস্থায় দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। সোহেলের হাত ব্যান্ডেজ করা, কানে তুলা দেওয়া—এই দৃশ্য দেখে দিশেহারা তার স্ত্রী ও তিন সন্তান।

সোহেল কান্নায় ভেঙে পড়ে বারবার অনুরোধ করেন, 'আমাকে যেকোনো উপায়ে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাও।'

সোহেলের মা আনজিলা বেগম বুকফাটা আর্তনাদ করে বলেন, 'আমি টাকা-পয়সা কিচ্ছু চাই না, আমার ছেলেকে জীবিত ফেরত চাই।' একই অভিযোগ করেছেন গোপালগঞ্জের আরেক ভুক্তভোগী পলাশ শেখের পরিবার। পলাশও বর্তমানে ড্রোন হামলায় আহত হয়ে একই মেডিকেল ক্যাম্পে চিকিৎসাধীন।

দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা ঘটনা অস্বীকার করে উল্টো পরিবারগুলোকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এই ভয়াবহ প্রতারণার ঘটনায় গত ১৯ মে সোহেলের পরিবারসহ ভুক্তভোগী চারটি পরিবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে।

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস জানান, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারগুলোকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

দেশের মাটি ছেড়ে ভাগ্য বদলের আশায় গিয়ে এখন রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে পড়া সোহেল ও তার সঙ্গীদের ফিরিয়ে আনতে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্বজনরা।