বিশ্বকাপে প্রতি আসরেই একটি প্রশ্ন ফিরে আসে ছোট দলগুলোর রূপকথা কোথায় গিয়ে থামবে? এবার সেই প্রশ্নের কেন্দ্রে কেপ ভার্দে। আফ্রিকার এই দ্বীপরাষ্ট্র গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক উন্নতি করেছে। শৃঙ্খলিত ফুটবল, দারুণ ফিটনেস আর দুর্দান্ত দলগত সমন্বয়ে তারা বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু সামনে যখন আর্জেন্টিনা, তখন বাস্তবতা আর স্বপ্নের মধ্যে ব্যবধানটা কতটা?
ফুটবল কখনোই শুধু পরিসংখ্যানের খেলা নয়। যদি তাই হতো, তাহলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এত অঘটন লেখা হতো না। সৌদি আরব একদিন আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছে, মরক্কো সেমিফাইনাল খেলেছে, ক্রোয়েশিয়া একাধিকবার ইউরোপের পরাশক্তিদের বিদায় করেছে। এসব উদাহরণই ছোট দলগুলোকে সাহস জোগায়। তাই কেপ ভার্দেও বিশ্বাস করতেই পারে, তাদের দিনও আসতে পারে।
কিন্তু বিশ্বাস আর বাস্তবতা এক নয়। আর্জেন্টিনা শুধু নামের জোরে বড় দল নয়। বড় মঞ্চে কীভাবে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, চাপ সামলাতে হয়, নকআউটে কীভাবে ভুলের সুযোগ না দিতে হয় এই অভিজ্ঞতাই তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। টুর্নামেন্ট যত গভীরে যায়, অভিজ্ঞতার মূল্য তত বাড়ে। এই জায়গাতেই কেপ ভার্দে অনেক পিছিয়ে।
কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সংগঠিত রক্ষণ। পুরো দল একসঙ্গে নিচে নেমে জায়গা বন্ধ করে দেয়। প্রতিপক্ষকে মাঝমাঠে সময় দেয় না। সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে উঠে আসে। ছোট দল হিসেবে এটাই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। আর্জেন্টিনাকে তারা বলের দখল ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষা করবে একটি বা দুটি সুযোগের জন্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পুরো ৯০ মিনিট কি এই পরিকল্পনা ধরে রাখা সম্ভব?
আর্জেন্টিনার আক্রমণে শুধু একজন তারকা নন, একাধিক ম্যাচজয়ী ফুটবলার ও লিওনেল মেসি রয়েছেন। তাদের মিডফিল্ড বলের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে জানে। দুই পাশ দিয়ে আক্রমণ গড়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ছড়িয়ে দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আর্জেন্টিনা ধৈর্য হারায় না। গোল না এলেও তারা একই ছন্দে খেলতে থাকে। ছোট দলগুলোর বিপক্ষে এই ধৈর্যই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয়। তবে কেপ ভার্দেকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এই দলটি বিশ্বকাপে এসে প্রমাণ করেছে, তারা কেবল অংশ নিতে আসেনি। শারীরিক শক্তি, আকাশে বলের দখল এবং সেট-পিসে তারা যথেষ্ট বিপজ্জনক। কর্নার কিংবা ফ্রি-কিক থেকে একটি গোল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। নকআউট ফুটবলে এমন উদাহরণ কম নেই।
আর্জেন্টিনার জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা হবে আত্মতুষ্টি। যদি তারা ধরে নেয় ম্যাচটি সহজ, তাহলে বিপদ ডেকে আনবে নিজেরাই। ছোট দলগুলোর সবচেয়ে বড় অস্ত্রই হলো প্রতিপক্ষের আত্মবিশ্বাসকে তাদের বিপক্ষে ব্যবহার করা। শুরুতে গোল না এলে চাপ ধীরে ধীরে ফেবারিট দলের ওপরই বাড়তে থাকে।
তবু সামগ্রিক শক্তির বিচারে দুই দলের মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট। আর্জেন্টিনার বেঞ্চের গভীরতা, বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা, টেকনিক্যাল দক্ষতা এবং মানসিক দৃঢ়তা সব দিক থেকেই তারা এগিয়ে। কেপ ভার্দেকে নিখুঁত ম্যাচ খেলতে হবে, আর একই সঙ্গে চাইবে আর্জেন্টিনার কয়েকটি ভুল। এই দুটি শর্ত একসঙ্গে পূরণ হওয়াই তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ফুটবলে অসম্ভব বলে কিছু নেই এই কথাটি সত্য। কিন্তু প্রতিটি অঘটনেরও একটি যৌক্তিক ভিত্তি থাকে। কেপ ভার্দে যদি আর্জেন্টিনাকে হারাতে চায়, তাহলে শুধু আবেগ নয়, অসাধারণ রক্ষণ, নিখুঁত পরিকল্পনা, কিছুটা ভাগ্য এবং আর্জেন্টিনার অফ-ডে, সবকিছু একসঙ্গে লাগবে।
আমার চোখে কেপ ভার্দে সম্মানজনক লড়াই উপহার দিতে পারে। হয়তো দীর্ঘ সময় ম্যাচে টিকে থাকবে, আর্জেন্টিনাকে ভোগাবে, দর্শকদের উদ্বেগেও রাখবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বড় দলের গুণগত মানই কথা বলবে।
ছোট দল ভালো করছে, সেটি নিঃসন্দেহে বিশ্ব ফুটবলের জন্য সুখবর। কিন্তু শুধু ভালো খেললেই আর্জেন্টিনাকে হারানো যায় না। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইতিহাস, অভিজ্ঞতা আর মানের যে সমন্বয় প্রয়োজন, সেই পরীক্ষায় এখনো আর্জেন্টিনাই অনেক এগিয়ে। তাই কেপ ভার্দের স্বপ্নকে সম্মান জানিয়েও বলতে হয়, এই ম্যাচে ফেবারিট আর্জেন্টিনাই, আর তাদের বিদায় ঘটাতে হলে কেপ ভার্দেকে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা অঘটনের জন্ম দিতে হবে।