জালুত-তালুত নেই, তবু আছে...

কুরআন ও বাইবেলের ইতিহাসে বর্ণিত দুই ঐতিহাসিক চরিত্র ডেভিড এবং গোলিয়াথ। আরব্য উপকথা এবং হিব্রু পুরাণে তারা পরিচিত তালুত (ডেভিড) এবং জালুত (গোলিয়াথ) নামে। যেখানে শক্তিশালী পলেস্টীয় বীর জালুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য তালুতকে বেছে নিয়েছিলেন বনি ইসরায়েলিরা। সে যুদ্ধে পরাক্রমশালী জালুতকে একটি গুলতি থেকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করে তৎকালীন পলেস্টীয়দের গৌরব ক্ষুণœ করেছিল তালুত। আদি পুস্তকের এ বর্ণনা ‘ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল’ যুদ্ধের বর্তমান প্রেক্ষাপটেও প্রাসঙ্গিক। হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের বর্বর আগ্রাসন মনে করিয়ে দিচ্ছে ‘জালুত-তালুত’ অতীত হলেও, তাদের উপস্থিতি এখনো রয়ে গেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, সেদিন ইসরায়েলের অভ্যন্তরে এক নজিরবিহীন হামলা চালায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। হামলায় ইসরায়েলে ১২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়; যাদের বেশিরভাগই ছিল বেসামরিক মানুষ। ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘদিন সংঘাতে লিপ্ত থাকলেও, ইসরায়েলে হামাসের ওই হামলা অনেকাংশেই অপ্রত্যাশিত ছিল। বিশ্লেষকদের মতে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের বর্বর আগ্রাসন ও গোষ্ঠীটির শীর্ষ নেতাদের হত্যার ফলে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল ওই হামলা। তবে হামাসের ওই হামলাকে কেন্দ্র করে এক অন্তত যুদ্ধের শুরু হয় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে। সেদিন হামলার পরপরই তেল আবিবের পাল্টা অভিযানের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ‘গাজা যুদ্ধ’ গতকাল বৃহস্পতিবার এক হাজার দিনে পৌঁছেছে। এই সময়ের মধ্যে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা কার্যত পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের জ্বলজ্বলে উদাহারণে। আলজাজিরা, এএফপি এবং গাজার সরকারি ও স্বাস্থ্য কর্র্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় অন্তত ৭৩ হাজার ৬৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৪ জন।

টানা দুই বছর ইসরায়েলের বর্বর ও নির্বিচার বোমা হামলায় কার্যত ধ্বংসস্তূপের নগরীতে পরিণত হয় ‘গাজা’। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ একটি শান্তিচুক্তিতে সম্মত হলেও, যুদ্ধের দামামা থামেনি। আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখেও বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজায় হামলা চালিয়ে গেছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভের মহাসচিব মুস্তফা বারগুতি বলেছেন, ইসরায়েল গাজায় ৩ হাজার ৫০০ বারেরও বেশি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর তা লঙ্ঘনের ফলে শত শত শিশুসহ ১ হাজার ৬০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি শহীদ এবং আরও ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি আহত হয়েছে। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় উপত্যকার ৯০ শতাংশের বেশি অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থল অভিযান, সামরিক অভিযান এবং জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনার মাধ্যমে গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ ভূখণ্ড এখন ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত বুধবার ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন বলেন, ইসরায়েল বর্তমানে গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এই নিয়ন্ত্রণ ‘১০০ শতাংশে’ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই মন্তব্যের পর হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম আরব লিগের জরুরি সম্মেলন আহ্বানের দাবি জানান। তার ভাষ্য- ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী নীতি শুধু ফিলিস্তিনিদের নয়, বরং বিশেষ করে মিসরসহ অন্যান্য আরব দেশের জন্যও হুমকি।

গাজার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরু থেকে উপত্যকাটিতে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার টন বিস্ফোরক নিক্ষেপ করেছে ইসরায়েল। তাদের দাবি, এটি ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেলা পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরক শক্তির প্রায় ১৬ গুণ। গাজায় নিহতদের মধ্যে অন্তত ২১ হাজার ৫০০ শিশু রয়েছে, যাদের মধ্যে ১ হাজার ২২ জন নবজাতক। আরও প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মানুষ এখনো নিখোঁজ; অনেকের মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। এছাড়া, ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় গাজায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৬২ জন সাংবাদিক, ১৪৫ জন সিভিল ডিফেন্স সদস্য এবং প্রায় ১ হাজার ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদ। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর বড় আকারের হামলা কমলেও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ১ হাজার ৫৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩৫০ জনের বেশি নারী ও শিশু। একই সময়ে আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, একই সময়ের মধ্যে তাদের পাঁচ সেনা ও একজন বেসামরিক ঠিকাদার নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ গত বুধবার সতর্ক করে বলেছে গাজায় ইসরায়েলের ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ বেসামরিক মানুষের জন্য প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করছে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় স্পষ্ট সীমারেখা নেই।

অবরোধে হাসপাতাল, দুর্ভিক্ষের শঙ্কা : গাজার সব সীমান্তপথ এখনো ইসরায়েলি বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কিংবা বন্ধ। ফলে খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও মানবিক সহায়তা প্রবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জাতিসংঘ গত মাসে জানায়, মৌলিক সরঞ্জামের অভাবে গাজার ১৭টি হাসপাতাল এখনো কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা গত বছরের আগস্টে গাজা সিটিতে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি ঘোষণা করেছিলেন। তবে গাজায় বেসামরিক কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ইসরায়েলি সংস্থা কোগাট দাবি করেছে, গাজায় প্রবেশ করা খাদ্যের পরিমাণ স্থানীয় জনগণের পুষ্টিগত চাহিদার চেয়েও বেশি। অন্যদিকে, গাজার লাখো বাস্তুচ্যুত মানুষ এখনো বিশাল তাঁবু শিবিরে কিংবা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসবাস করছেন। অনেক ফিলিস্তিনির ভাষ্য, এক হাজার দিনের যুদ্ধ তাদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার সব সীমা অতিক্রম করেছে।

ইসরায়েলে শোক, বিক্ষোভ ও তদন্তের দাবি : যুদ্ধের এক হাজারতম দিনে ইসরায়েল জুড়েও স্মরণসভা, পদযাত্রা, বিক্ষোভ ও এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়েছে। প্রথম অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল ৬টা ২৯ মিনিটে ঠিক যে সময়ে ২০২৩ সালের হামলা শুরু হয়েছিল। নিহতদের স্বজন, বেঁচে ফেরা ব্যক্তি ও সাবেক জিম্মিদের নিয়ে গঠিত ‘অক্টোবর কাউন্সিল’ ছিল কর্মসূচির অন্যতম আয়োজক। তাদের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘পরিত্যাগ, অবহেলা, ধামাচাপা ও ব্যর্থতার এক হাজার দিন।’ সংগঠনটি বলেছে, জিম্মিদের পরিবার ও নিহতদের স্বজনরা এখনই রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানাচ্ছেন। জনমত জরিপগুলোও দেখাচ্ছে, রাজনৈতিক বিভাজন সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক ইসরায়েলি ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠনের পক্ষে। তবে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার এখনো এমন কমিশন গঠনে রাজি হয়নি।

গাজার সীমান্ত এলাকায় ফিরছে ইসরায়েলিরা : ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের এক হাজার দিন পূর্তিতে গাজার সীমান্তবর্তী দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে আরও পাঁচ হাজার ইসরায়েলি বসতি স্থাপন করেছে। হামলার আগে ওই এলাকায় প্রায় ৬২ হাজার ইসরায়েলির বসবাস ছিল। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ বাসিন্দা ফিরে এসেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সেখানে ১ লাখ ২৪ হাজার মানুষের বসবাস নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ইসরায়েলি সরকার। ইসরায়েলের টেকুমা ডিরেক্টরেট জানিয়েছে, সীমান্ত অঞ্চল পুনর্গঠনের জন্য এক হাজারের বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা জোরদার, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, কৃষি খাতে বিনিয়োগ এবং শিল্পকারখানা স্থানান্তরে প্রণোদনা।

যে প্রশ্ন রয়ে গেছে : এক হাজার দিনের যুদ্ধের পরও গাজার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। বন্দিদের মুক্তি, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, পুনর্গঠন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান কোনো বিষয়েই এখনো স্পষ্ট অগ্রগতি নেই। ধ্বংসস্তূপ, মানবিক বিপর্যয় এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের সমাপ্তি কবে ঘটবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।