কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের আলোচনা ঘিরে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। সাম্প্রতিক সংঘাতের পর দুই পক্ষ কূটনীতির টেবিলে ফিরলেও, দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হয়নি। যদিও উভয় দেশের প্রতিনিধিরা গত মঙ্গলবারই দোহায় পৌঁছেছে। তবে গতকাল বুধবার যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে হওয়া চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা পরোক্ষ আলোচনায় বসেন বলে জানিয়েছে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি। এই আলোচনার বিষয়ে অবগত একজন কূটনীতিক এএফপিকে বলেন, লেক লুসার্ন সম্মেলনের অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া সমঝোতা স্মারক নিয়ে কাতারি ও পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে কারিগরি পর্যায়ের পরোক্ষ আলোচনায় বসেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা। এক বিবৃতিতে পরোক্ষ আলোচনার বিষয়ে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কারিগরি প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়েছে। মধ্যস্থতাকারীদের অংশগ্রহণে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এসব বৈঠক হয়, যাতে দোহা বা অন্য যেকোনো স্থানে আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। তবে মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে, বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হচ্ছে না।
রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার এই কারিগরি আলোচনায় অংশ নেয়নি। তবে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে মঙ্গলবার কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জাসিম আল থানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারা। এ বৈঠকের পর কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় চলমান আলোচনার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সংলাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়েও মতবিনিময় হয়েছে। বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানায়, কাতারের প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকের আওতায় চলমান আলোচনায় কাতারের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ইরান আলোচনার পরবর্তী ধাপে যাবে না। এর মধ্যে লেবাননের যুদ্ধের অবসান এবং সমঝোতা বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিভিন্ন পদক্ষেপও রয়েছে। গালিবাফ বলেন, ‘আমরা আলোচনাও করছি। কিন্তু তারা যদি আলোচনায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে না চায়, তাহলে আমরাও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।’ তিনি জানান, সমঝোতা স্মারকের লেবানন-সংক্রান্ত ধারাগুলোর বাস্তবায়ন তদারকিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, সমঝোতা স্মারকের- ১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারা পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা চলবে। এ সব ধারার মধ্যে রয়েছেÑ লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানের তেল রপ্তানি নিশ্চিত করা এবং দেশটির অবরুদ্ধ সম্পদ অবমুক্ত করা।
গালিবাফ জানান, লেবানন পরিস্থিতিতে সংঘাত এড়াতে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও লেবানন একটি যৌথ ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’ গঠনে একমত হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে নিজেদের প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ স্কট উহলিঙ্গার বলেছেন, দোহায় ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা না হলেও পরোক্ষ কারিগরি বৈঠকের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সম্ভাব্য উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। আলজাজিরাকে তিনি বলেন, আগে থেকেই নির্ধারিত কারিগরি বৈঠকগুলো ব্যবহার করে ভবিষ্যতে তৈরি হতে পারে এমন জটিলতা এড়াতে চাইছে ওয়াশিংটন।
ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা সফল হোক বা ব্যর্থ উভয় পরিস্থিতিতেই যুক্তরাষ্ট্র শক্ত অবস্থানে থাকবে। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্যই আলোচনা সফল হোক, সেটাই চায়। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তুলনায় ‘অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে’ থাকবে।